অন্ধকারে বাতিঘর

আনিস আলমগীর

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৯:৩৯ এএম, ৩ এপ্রিল ২০১৯ বুধবার

আনিস আলমগীর

আনিস আলমগীর

শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের কাছ থেকে হত্যার হুমকি পেয়েছেন, আবার সময়োপযোগী ও যথাযথ উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের দাবিও উঠেছে। জাতি-ধর্ম, ইমিগ্র্যান্ট এবং নন-ইমিগ্র্যান্ট নির্বিশেষে সবাইকে আপন করার মধ্য দিয়ে এই সংঘাতময় বিশ্বে কীভাবে নেতৃত্ব দিতে হয় তার একটা উদাহরণও সৃষ্টি করলেন। তিনি আর কেউ নন, তিনি বিশ্বের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন।

দেশটা উন্নত দেশ হলেও লোকসংখ্যা মাত্র ৫০ লাখ। এক ক্রিকেট খেলা ছাড়া অন্য কোনও বিষয়ে দেশটা কখনও আলোচনায় এসেছে মনে পড়ে না। আমাদের দেশের অধিকাংশ লোক দেশটির নাম জানত কিনা এটা নিয়েও সন্দেহ হয়। নিউজিল্যান্ডের মানুষ প্রায় অভিবাসী। তাই মিশ্র জনগোষ্ঠী। শ্বেতাঙ্গরা বেশি হলেও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীও রয়েছে।

মুসলমানরা গিয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়াসহ মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে। সংখ্যায় তারা মাত্র ১ লাখ। সম্ভবত ক্রাইস্টচার্চ শহরেই তারা বেশি বসবাস করে। কুক প্রণালীর একপাশে রাজধানী ওয়েলিংটন, অপরপাশে ক্রাইস্টচার্চ শহরের অবস্থান। গত ১৫ মার্চ শুক্রবারই জুমার নামাজের সময় বন্দুকধারীর হামলায় সেখানকার দুই মসজিদে কমপক্ষে ৫০ জন নিহত হয়। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসী ব্রেটন ট্যারান্ট তার অস্ত্রের সঙ্গে ভিডিও ক্যামেরা সংযোজন করে হামলার দৃশ্য ফেসবুকের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করেছিল, যেন বিদ্বেষ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

 

সন্ত্রাসী ব্রেটন অস্ট্রেলীয় নাগরিক। সে ইউরোপ সফর করেছিল, সেখানেই তার মুসলিম বিদ্বেষের হাতেখড়ি। হামলার শিকার হতাহত ব্যক্তিরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে গিয়ে নিউজিল্যান্ডের নাগরিকত্ব পেয়েছে, যার মধ্যে আছে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিশর, জর্ডান এবং সোমালিয়া। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর অতিদ্রুত এবং স্পষ্টভাবে এই হামলাকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে বর্ণনা করেন। ক্রাইস্টচার্চে ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর স্বজনদের জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা ও সমবেদনা জানান তিনি। সে সময় মাথায় কালো রঙের স্কার্ফ পরেন। ঘটনার দিন থেকে আরডার্ন-এর প্রতিটি কথা, প্রতিটি পদক্ষেপ প্রশংসা কুড়িয়েছে শুধু তার দেশে নয়, বিশ্বজুড়ে। ইমিগ্র্যান্টদের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, ‘তারা আমাদের’। এর কয়েক দিন পর প্রথমবারের মতো পার্লামেন্টে ভাষণ দিতে গিয়ে ইসলামি কায়দায় সবাইকে সম্ভাষণ জানিয়েছেন ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে।

হামলার ঘটনার কয়েক দিন পরেই তিনি দেশের অস্ত্র আইনের কঠোর সংস্কারের ঘোষণা দেন। তিনি নিউজিল্যান্ড এবং বিশ্ব থেকে বর্ণবাদ ‘বিতাড়িত’ করার প্রতিশ্রুতি দেন। জোর দিয়ে বলেন, এই বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে ‘সীমানা দিয়ে ভাবলে আমাদের চলবে না’।

সারাবিশ্ব এই ঘটনাকে উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের উত্থানের সঙ্গে মেলাতে চাইলেও সেই চোখে দেখতে আগ্রহী হননি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা ক্ষুদ্র একটা গোষ্ঠী। তিনি শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদকে হুমকিও মনে করেন না। ঘটনার পর ট্রাম্প আরডার্নকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমেরিকা কী ধরনের সহায়তা দিতে পারে?’ জবাবে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সব মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য সহমর্মিতা এবং ভালোবাসা।’

ট্রাম্পের পক্ষে কি তা আদৌ সম্ভব? ২০১৬ সালের নির্বাচনে আমেরিকায় ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তিনিও বর্ণবাদী মানুষ। ‘আমেরিকা আমেরিকানদের জন্য’– এ স্লোগান তুলে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। ট্রাম্পের কাছে আমেরিকান হলো শ্বেতাঙ্গরা। এখন অভিবাসীর আগমন প্রতিরোধ করার জন্য মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ করছেন। হত্যাকারী হত্যাকাণ্ডের আগে যে ইশতেহার প্রকাশ করেছিল তাতে ট্রাম্প আর হিটলারের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। হিটলার গত শতাব্দীতে আর ট্রাম্প এ শতাব্দীতে বর্ণবাদীদের নেতা। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা ভেতরে ভেতরে যে কোনও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে তাদের শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদকে টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর।

আমেরিকার টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর তাদের কাছে বদ্ধমূল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াচ্ছে মুসলমানরা। তাই সম্ভবত তারা চাচ্ছে একাদশ শতাব্দীর ধর্মযুদ্ধের মতো একটা ধর্মযুদ্ধের অবতারণা করে মুসলিম শক্তিকে ধূলিসাৎ করে দিতে। ১০৯৫ খ্রিস্টাব্দে সমগ্র ইউরোপ সম্মিলিতভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ করেছিল। অজুহাত ছিল জেরুজালেম তাদের তীর্থস্থান, তারা মুসলমানদের হাত থেকে তার দখল বুঝে নেবে। দেড় শত বছর এ ধর্মযুদ্ধ চলেছিল। সম্মিলিত ইউরোপীয় শক্তি খ্রিস্টের কবরটি পর্যন্ত কোনও সময় দখলে রাখতে পারেনি। এ দেড় শত বছরের মধ্যে ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড, ফ্রান্সের রাজা নবম লুইও পরাজিত হয়েছিলেন। এ ধর্মযুদ্ধের সময় পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল তারা হারিয়েছে তুর্কিদের হাতে ১৪৫৩ সালে। এখনও এ বিখ্যাত শহরটি তুর্কিদের দখলে রয়েছে, তারা তার নাম পরিবর্তন করে রেখেছে ইস্তাম্বুল।

ব্রেটন ট্যারান্ট ৭৩ পৃষ্ঠার যে ইশতেহার প্রকাশ করেছে তাতে কনস্টান্টিনোপলের আয়া-সুফিয়ার জন্য আফসোস প্রকাশ করেছে। কনস্টান্টিনোপল বা ইস্তাম্বুল হচ্ছে তুরস্কের ইউরোপীয় অংশ। পশ্চিম এশিয়ার এ দেশটির অবস্থান এশিয়া এবং ইউরোপের অংশ নিয়ে। যে কারণে তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হয়েছে, অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য এখনও হতে পারেনি।

যাক, ধর্মের কথা বলে মানুষকে যেভাবে একত্রিত করা যায় অন্য কথায় সহজে মানুষের সম্মিলন গড়ে তোলা তত সহজ নয়। অনেক সময় অনুরূপ জাগরণে নেতৃত্বের দুরভিসন্ধি থাকে। ধর্মযুদ্ধের প্রেরণা জুগিয়েছিলেন যিনি সেই সাধু পিটারেরও নাকি একটা দুরভিসন্ধি ছিল। তখনকার দুনিয়ায় কনস্টান্টিনোপল ছিল খুবই লোভনীয় শহর এবং সেখানে ছিল অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের বসবাস। তারা রোমের পোপকে মানত না। সাধু পিটার চেয়েছিলেন ধর্মযুদ্ধের নামে বিবাদ লাগিয়ে কনস্টান্টিনোপল শহরটি রোমের পোপের অধীনে আনতে। যেন খ্রিস্টান জগতে তার নেতৃত্বটা বিনা বিতর্কে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু মানুষের অনেক আশা অনেক সময় সফল হয় না। সাধু পিটারের স্বপ্নও সফল হয়নি। ইউরোপ তার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োগ করেও কখনও জেরুজালেমের দেবস্থানটি মুসলমানদের হাত থেকে একেবারে উদ্ধার করতে পারেনি। এদিক থেকে বলা যায় ধর্মযুদ্ধের ইতিহাস ইউরোপের পক্ষে একটানা বিফলতার ইতিহাস।

আমেরিকার টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা বিষয়টাকে সহজভাবে নেয়নি। ইউরোপে যেমন শেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের উত্থান ঘটছে তেমনি ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আমেরিকায় ট্রাম্পের মতো বর্ণবাদী মানুষও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য এটা আতঙ্কের বিষয়। ভয় হয় একাদশ শতাব্দীর মতো কোনও পরিস্থিতির উদ্ভব হয় কিনা? নিউজিল্যান্ডের হামলার পর ছোট এ দেশটার অবস্থা ঘোলাটে হতে পারত, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নের বলিষ্ঠ মানবতাবাদী ভূমিকা পরিস্থিতিকে ঘোলাটে হতে দেয়নি। মুসলমানদের বিক্ষুব্ধ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সহানুভূতি প্রকাশে যে আন্তরিক ভূমিকা পালন করেছেন তাতে মনে হচ্ছে মুসলমানরাও যথাযথ সান্ত্বনা পেয়েছেন। তার ভূমিকার জন্য বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষ তাকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারে না। সিরিয়ান বাস্তুত্যাগীদের ব্যাপারে জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল শত বিরোধিতার মুখে যে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন তা দেখেও বিশ্ববাসী বিস্মিত হয়েছিল। আসলে এ দুই মহীয়সী নারী প্রমাণ করলেন, তারা দুজনই ঘোর অন্ধকারের বাতিঘর।

গত ২৯ মার্চ শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চের মসজিদের পাশে হ্যাগলি পার্কে স্মরণকালের এক বৃহত্তম শোকসভার আয়োজন করা হয়েছিল। জনসভার অনুষ্ঠানটি সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়। শোকসভায় তিনি নিজে বক্তৃতা দিয়েছেন আবার মুসলমান নেতারাও বক্তৃতা দিয়েছেন। জীবিত নামাজিদেরও অনেকে বক্তব্য পেশ করেছেন। ব্রিটিশ গায়ক ক্যাট স্টিভেন্স গান পরিবেশন করেছেন। ক্যাট স্টিভেন্স ১৯৭০ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। তার বর্তমান নাম ইউসুফ ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন এমন কোনও পদক্ষেপ নেই যা নিচ্ছেন না, যেন মুসলমান জনগোষ্ঠী ভয়ভীতি থেকে মুক্তি পান। শান্তিকামী বিশ্বে শান্তি সংহতির পক্ষকে তার এই ঐতিহাসিক ভূমিকা বহুদিন প্রেরণা জোগাবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।