আজ আত্মসমর্পণ: আলোর পথে ৬১৪ চরমপন্থি

নিউজ রাজশাহী ডেস্ক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ১০:৩০ এএম, ৯ এপ্রিল ২০১৯ মঙ্গলবার

`জলদস্যু-বনদস্যুদের আত্মসমর্পণ দেখে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার তাগিদ অনুভব করেছি। কতকাল আর মাথার ওপর মামলা নিয়ে নির্বাসিত জীবন যাপন করব! পরিবার নিয়ে বাকিটা জীবন সুখে-শান্তিতে কাটাতে চাই। তাই অন্ধকার জীবন পেছনে ফেলে আলোময় জীবনের খোঁজে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।`

দীর্ঘদিন চরমপন্থি সংগঠনগুলোর একটির নেতৃত্ব দেওয়া এক ব্যক্তি গতকাল সোমবার কাছে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে তার মতো আরও ৬১৩ জন আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিয়েছেন। সব মিলিয়ে আজ মঙ্গলবার পাবনা জেলা স্টেডিয়ামে আত্মসমর্পণ করছেন ৬১৪ চরমপন্থি। তারা চারটি সংগঠনের ২০টি গ্রুপে ভাগ হয়ে ১৪টি জেলায় কাজ করছিল। আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় তাদের কাছ থেকে একে-৪৭সহ দেশি-বিদেশি মিলিয়ে একশ` অস্ত্র পাওয়া যেতে পারে, যা তারা আজ জমা দেবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, অতীতের ভুল-ভ্রান্তির জন্য ক্ষমা চেয়ে ৬১৪ জন চরমপন্থি আত্মসমর্পণ করছে। চরমপন্থি, সন্ত্রাসী বা মাদক ব্যবসায়ী; যে-ই হোক, অতীতের ভুল-ভ্রান্তি ভুলে আত্মসমর্পণ করলে তা দেশের জন্য মঙ্গলজনক। মন্ত্রী আরও বলেন, আজ থেকে ৩০ বছর আগেও দেখা যেত- বাংলাদেশে চরমপন্থিরা বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে প্রভাব বিস্তার করত। তারা একটি বলয়ের মাধ্যমে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করত। এরা ক্রমশ দুর্বল ও ছোট হয়ে গেছে। সংখ্যাও কমে গেছে। এখন যে কয়েকটি গ্রুপ আছে, তাদের অধিকাংশই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, আত্মসমর্পণ করা ৬১৪ চরমপন্থিকে আজ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী তারা চাকরি পাবেন। সরকারই তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেবে। কেন চরমপন্থিরা আত্মসমর্পণ করছেন- এমন প্রশ্নে পুলিশ সুপার বলেন, তারা দেখছেন, চরমপন্থি সংগঠনে থেকে তাদের কোনো লাভ হচ্ছে না। বরং জলদস্যু-বনদস্যু যারা আত্মসমর্পণ করেছেন, তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালো আছেন। এতে চরমপন্থিরা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। যারা আত্মসমর্পণ করবেন, তারা এখন পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন।

জানা যায়, যেসব জেলার চরমপন্থিরা আত্মসমর্পণ করছেন তার মধ্যে রয়েছে- রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জয়পুরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, যশোর, নড়াইল ও টাঙ্গাইল। এসব জেলায় চরমপন্থিরা পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (লাল পতাকা), পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি, নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট ও কাদামাটির হয়ে সক্রিয় ছিলেন। পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (লাল পতাকা) ১২৭ সদস্য ১৩টি আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করবেন।

লাল পতাকা বাহিনীর রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোর অঞ্চলের নেতা আবদুর রাজ্জাক ওরফে আর্ট বাবু সোমবার বলেন, ১৯৯৯ সালে লাল পতাকা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ছাত্র ছিলাম। ২০০৪ সালের ২২ মে গ্রেফতার হয়েছি। ২০১৪ সাল পর্যন্ত কারাগারে বন্দি ছিলাম। ওই বছর কারাগার থেকে বেরিয়ে বিয়ে করি। কারাগারে থাকার সময় মনে হয়েছে, যে আদর্শ নিয়ে লাল পতাকা বাহিনীর হয়ে কাজ শুরু করেছি তা প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছি। দেশের বাস্তবতায় ওই আদর্শকে খাপ খাওয়াতে পারিনি।

আর্ট বাবু আরও বলেন, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ইশতেহারে ঘোষণা দেয়- চরমপন্থি সংগঠনের কেউ সুপথে ফিরে আসতে চাইলে সে সুযোগ দেওয়া হবে। তখনই কারাগারের ভেতরে অন্যদের আত্মসমর্পণের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে উদ্বুদ্ধ করেছি।

চরমপন্থি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত আরেকজন বলেন, জলদস্যু-বনদস্যু ও মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। প্রথমে ভেবেছি, তারা পরবর্তীকালে কোনো বিপদে পড়ে কি-না! পরে দেখলাম, তারা ভালো আছেন। ২০ বছর পালিয়ে বেড়াচ্ছি। বাবা-মা-সন্তান রেখে যে জীবন কাটিয়েছি, সেই জীবনের কোনো স্বাদ নেই। সরকার যদি এখন সমাজের মূল স্রোতধারায় মিশে যাওয়ার সুযোগ দেয়, সেটাই বড় পাওয়া। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এক নামে পরিচিত আরেক চরমপন্থি নেতা জানালেন, সংগঠনের নেতৃস্থানীয়দের সিদ্ধান্তে তারা আত্মসমর্পণ করছেন।