আরাফাতের সমীকরণের রাজ্যে

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৩:৩৭ পিএম, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ বুধবার

ঘরের ভেতরের চার দেয়ালজুড়েই সাঁটানো সারি সারি কাগজ। তাতে লেখা পদার্থ, রসায়ন, গণিত ও জীববিজ্ঞানের জটিল জটিল নানা সমীকরণ, সূত্র, বৈজ্ঞানিক নাম। লেখা রয়েছে দেশ-বিদেশের নানা অজানা তথ্যও । টয়লেটের দরজায়ও সাঁটানো হয়েছে সেইসব কাগজ।

শুধু কি তাই, ঘরের ভেতরে কিউবিক পদ্ধতিতে চতুর্দিকে দড়ি টানিয়ে টানানো হয়ছে সমীকরণের সেইসব কাগজ। ঘরের মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত টানানো সেসব কাগজ। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সেই দড়ির মাঝে মাঝে বেঁধে দেওয়া হয়েছে রঙিন বেলুন। এমনকি ঘরের মেঝেতেও আঁকানো হয়েছে জীববিজ্ঞানের নানা চিত্র। এত এত সমীকরণের ভিড়ে ঘরের এক কোণে দেয়ালে আঁকানো বাংলাদেশের মানচিত্র। লাল-সবুজের উপরে ও নিচে লেখা ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ`। 

রাজশাহী মহানগরীর মালোপাড়ায় মনসুর আলীর তিনতলার বাসার নিচতলার একটি কক্ষে গেলে এমন দৃশ্যই চোখে পড়বে। কক্ষের যেদিকে তাকানো যায় না কেন, বিজ্ঞানের নানা সমীকরণ, সূত্র ও বৈজ্ঞানিক নাম লেখা সংবলিত কাগজ সাঁটানো চতুর্দিকে। ঘরে ঢুকেই মনে হবে, এ যেন সমীকরণের রাজ্যে প্রবেশ করলাম। বাইরের গুমোট আবহাওয়া ছেড়ে মনে হবে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচা গেল।

মনসুর আলীর তিনতলা বাসার নিচতলা পুরোটাই মেস। সেখানে কলেজ বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের গুটিকতক ছাত্ররা থাকে। পুরো মেসটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন, স্যাঁতসেতে। কিন্তু ঘরটাই ঢুকলেই মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠবে।

এই ঘরটির বাসিন্দা মো. আরাফাত নামের এক ছাত্র। তিনি যখন রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন তখন থেকে তিনি এ রুমটিতে আছেন। তিনি এবছর ভর্তি পরীক্ষায় দিনাজপুর সরকারি মেডিকেল কলেজে (এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ) চান্স পেয়েছেন। ডেন্টাল পরীক্ষায় জাতীয় মেধায় ৩১তম স্থান অর্জন করেছেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন।

আরাফাত বলেন, ‘একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির পর থেকে দুই বছরে এই রুমটি সাজিয়েছি। আমার যেহেতু লক্ষ্যই ছিলো মেডিকেলে পড়বো, তাই স্বভাবত বিজ্ঞানের সমীকরণ, সূত্র ও বৈজ্ঞানিক নাম ও সাধারণ জ্ঞান দিয়ে রুমটি সাজিয়েছি। আর আমি চেয়েছি, যাতে ক্লাস পরীক্ষার বাইরে সবসময় রুমটিতে থাকতে পারি, পড়াশুনার মধ্যে থাকতে পারি। এইজন্য রুমটিকে বর্ণিল করে সাজানো। এইজন্য আমার অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে, কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে’।

বিভিন্ন জোন: আরাফাত শুধু সমীকরণ, সূত্র ও বৈজ্ঞানিক নাম কাগজে লিখে সেখানে দেয়ালে সাঁটিয়েই ক্ষান্ত দেন নি। সেগুলোকে তিনি সাজিয়েছেন বিভিন্ন জোনে। তার জোনগুলোর মধ্যে রয়েছে, ফিজিক্স জোন, কেমেস্ট্রি জোন, বায়োলজি জোন, ফর্মূলা জোন, মিক্সড জোন, মশলা জোন, জিকে জোন ও ছ্যাঁকা জোন।

ফিজিক্স, কেমেস্ট্রি ও বায়োলজি জোনে সাবজেক্টগুলোর নানা সমীকরণ, সূত্র ও বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। ফর্মূলা জোনে সব বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণগুলো। জিকে জোনে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোর সাধারণ জ্ঞান, মশলা জোন হচ্ছে শেষ মুর্হূতের প্রস্তুতি। এছাড়া ছ্যাঁকা জোনে পরীক্ষায় যেসব সমীকরণ ও সূত্র বারবার ভুল হয়, সেসব সূত্র ও সমীকরণ টানানো রয়েছে। 

এছাড়া মেঝেতে মানব ও রুইমাছের হৃদপিণ্ড, জবার পুষ্প প্রতীক, নিউরণ, নেফ্রন, ওমাটিডিয়াম ও কোষঝিল্লিসহ জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের উপরে ফিগারগুলো বর্ণিলভাবে আঁকানো আছে।

তবে সব ছাপিয়ে ঘরের মূল আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে লাল সবুজ পতাকার মধ্যে লাল বৃত্ত, সেই বৃত্তের মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্র। উপরে লেখা রয়েছে, হৃদয়ে বাংলাদেশ। এটা আরাফাাতের ফটোশুট জোন।

আরাফাত বলেন, আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিলো মেডিকেলে চান্স পাওয়া। সেই চান্স পাওয়ার জন্য যা যা করার সবই করেছি’।

মুনসুর আলীর এই মেসটিতে মোট সাতজন বোর্ডার থাকেন। তাদের একজন তাকিউল ইসলাম বলেন, আরাফাত যে কখন পড়তো আর কখন ঘুমাতো তার কোনো ঠিক ছিলোনা। সবসময় সে শুধু পড়ার মধ্যেই থাকতো। সারারাত পড়ারও রেকর্ড আছে। খাওয়া-দাওয়ারও ঠিক ছিলো না। এমনকি পড়ার জন্য খাট থেকে তোশক সরিয়ে ফেলেছিলো, যাতে পড়তে গিয়ে ঘুমিয়ে না পড়ে।

আরেক বোর্ডার আসলাম আলী বলেন, সারাদিন পড়ালেখা করবে এই মনে করেই সে দুই বছর ধরে রুমটি সাজিয়েছে। আমরা মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়েছি কিন্তু বাধা দিইনি।

আরাফাত উচ্চ মাধ্যমিকে পাসের পর ফাহাদ মেডিকেল কোচিংয়ে কোচিং করেছেন। সেই কোচিংয়ের পরিচালক ডা. ফাহাদ ইবনে মাহফুজ বলেন, অনেক স্টুডেন্টকে দেখা যায়, সাধারণত দেয়ালে বিভিন্ন সমীকরণ, সূত্র ও বৈজ্ঞানিক নাম সাঁটায়। আমিও ঢাকা মেডিকেলে পড়ার সময় বা উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় দেয়ালে বিভিন্ন সমীকরণ ও সূত্র লিখে রাখতাম। কিন্তু এর মতো পুরোরুমে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত ও চার দেয়ালে এভাবে সমীকরণ ও সূত্র টানাতে দেখিনি’।

আরাফাতের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের ঈশ্বরপুর গ্রামে। বাবা মো. মনিরুল ইসলাম পেশায় স্কুল শিক্ষক। তিন ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় তিনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর এ বি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি এসএসসি পাস করেছেন। দরিদ্র স্কুল শিক্ষকের সন্তান আরাফাতের একমাত্র লক্ষ্য ভালো ডাক্তার হয়ে দেশসেবা করা।

আরাফাত বলেন, আমার প্রথম লক্ষ্য একজন ভালো মানুষ হওয়া । তারপর একজন ভালো ডাক্তার হওয়া। জানিনা কতটা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো।

তবে দিনাজপুর মেডিকেলে ভর্তির কারণে এই মাসেই তাকে মেসটা ছেড়ে দিতে হবে। তাই তার দুঃখ দুই বছর ধরে যত্ম করে গড়ে তোলা তার এই সমীকরণ রাজ্য কি তাহলে নষ্ট হয়ে পড়বে?