আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যান নজর কাড়ছে ভ্রমণ পিপাসুদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৬:১৩ পিএম, ২ অক্টোবর ২০১৯ বুধবার

ধামইরহাটের উপজেলা সদর থেকে ভ্যান অথবা ইজিবাইকে করে উত্তরে মাত্র ৫ কি.মি. পথ। অল্প এই পথ পাড়ি দিলেই আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যান যা নজর কেড়েছে ভ্রমণপিপাসু মানুষদের। সেখানকার  সু-বিশাল শালবন, আর সু-বিস্তৃত দীঘির উত্তর পাড়েই তারকাঁটায় ঘেরা ভারতের সীমান্ত ফাঁড়ি। বনের ভেতরে আঁকাবাঁকা পথের ধারেই উই পোঁকার ঢিবি, যেনো স্বর্গীয় দেবদূত এসে নিজ হাতে বানিয়েছে, আর বাহারী জংলী গাছের লতা পাতায় মোড়ানো প্রকৃতির আশির্বাদে দাড়িয়ে আছে অগনিত শাল গাছ।

একটু এগিয়ে যেতেই মেঘেরা হাড়িয়ে যায় অগুনিত শালগাছের আড়ালে, যেনো হঠাৎ করে নেমে আসে অন্ধকার আর তখনি শিউরে ওঠে গায়ের লোম। দুর থেকে চোখে পড়ে জংলী ফুল, অচেনা ফুলের ঘ্রাণে জেগে ওঠে প্রেম। নাম না জানা অচেনা পাখি আর কোকিলের ডাকে নিমিষেই যেন নেমে আসে বসন্ত। গহীন অরণ্যের আঁকাবাঁকা পিচঢালা পথের ধারে নেমে আসে সন্ধ্যা।

যেতে যেতে খানিকটা পথ এগোতেই শালপাতার মড়মড় শব্দে মনে পড়ে ছোট বেলায় দাদা দাদীর ঘুম পাড়ানির গল্পের বাঘ মামার কথা, একবার ভেবে দেখুন তখন আপনার বুকের ভেতরে কি হতে পারে? 

কথিত আছে, আনুমানিক ১৪০০ সালে এ অঞ্চলে রাজত্ব করতেন রাজা বিশ্বনাথ জগদ্দল। তখন রাজার রাজত্বকালেই একবার প্রজাসাধারণের খাবার পানির প্রকট সংকট দেখা দেয়। মাঠ ঘাট শুকিয়ে চৌচির হওয়ায় আবাদি জমিতে ফসল ফলানো হয়ে ওঠে অসম্ভব।

হঠাৎ একদিন রানী স্বপ্নের মাঝে দেখলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না পা ফেটে রক্ত বের হবে ততক্ষণ তিনি হাঁটতে থাকবেন এবং যেখানে গিয়ে পা ফেটে রক্ত বের হবে ততদূর পর্যন্ত একটি দিঘী খনন করে দিলেই সেই দীঘি পানিতে পরিপূর্ণ হবে তাতেই পানির প্রকট অভাব থেকে মুক্তি পাবে প্রজাসাধারণ।

সকালে ঘুম থেকে উঠে রাণী রাজার কাছে তার স্বপ্ন অনুযায়ী একটি দীঘি খননের দাবী জানালে রাজা চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে পড়েন। একদিন প্রেম পুজারী রাজা রাণীর দাবি মেনে নিতে বাধ্য হলেন এবং একটি দীঘি খনন করে দিতে রাণীকে আসস্থ্য করলেন। প্রজাদের দুঃখ দুর্দশা দূর করবার জন্য রানী স্বপ্ন অনুযায়ী হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলেন।

সঙ্গে ছিল রাণীর পাইক পেয়াদা, লোক লস্কর। একদিন রাণী হাঁটতে শুরু করলেন, তিনি হাঁটছেন তো হাঁটছেন বহুদুর হাঁটার পরও রানী থামছিলেন না, এভাবে রাণী হাঁটতে থাকলে পায়ে কষ্ট পাবেন ভেবে রাজা রাণীকে দাঁড়াতে বলেন, কথা না শুনেই প্রজাদের পানির কথা ভেবে রাণী হাঁটতেই থাকেন। রাণীর কষ্টের কথা ভেবে রাজা মন্ত্রী এবং উপস্থিত পাইক-পেয়াদাদের নিয়ে রাণীকে আটকানোর কৌশল বের করলেন, পাইক-পেয়াদারা রাজাকে বলেন রাণীমার পায়ে আলতা না ঢেলে দিলে তিনি কখনোই থামবেন না তখন রাজার হুকুমে তাদের একজন মন্ত্রী রানীর পায়ে আলতা ঢেলে দিলেন আর চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘রানী মা, আপনার পা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে।

একথা শুনে রানী তাঁর পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখেন সত্যিইতো পা থেকে রক্ত ঝড়ছে, আলতাকে রক্ত ভেবে রাণী সেখানেই বসে পড়েন, প্রেম পুঁজারী রাজা বিশ্বনাথ জগদ্দল ওই স্থান পর্যন্ত একটি দিঘী খনন করে দিলেন। এরপর অলৌকিক ভাবে মুহূর্তেই বিশুদ্ধ পানিতে ভরে ওঠে দিঘী। লোক মুখে কথীত আছে রানীর পায়ে আলতা ঢেলে দেয়ায় সেই থেকে রাজা বিশ্বনাথ জগদ্দল, দিঘীটি আলতাদীঘি নামে নামকরণ করেন।

প্রায় ২৬৪.১২ হেক্টর এই বনভূমির ঠিক মাঝখানে রয়েছে ৪৩ একর আয়তনের বিশাল দিঘী। দিঘীর সচ্ছ পানিতে ফুটে থাকা হাজারো পদ্মফুল যে কোন ভ্রমণ পিপাসু মানুষকে বিমোহিত করবে। প্রতি বছর শীত যখন জেঁকে বসে, তখন ভারত সীমান্ত ঘেষা এই দিঘীতে বিভিন্ন প্রজাতির নাম জানা, না জানা অতিথি পাখি এসে দিঘীর নির্মল পানিতে দাপিয়ে বেড়ায়, ডাহুক, পানকৌড়ির কলকাকলি আর তাদের চঞ্চল উড়াউড়িতে প্রাণ প্রাচুর্যে মুগ্ধ হয় যেকোন বয়সের মানুষের হৃদয়।

কেউ কেউ বলেন, প্রাচীন দীঘি গুলির মধ্যে এটিই বোধ হয় বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সচল দিঘী। উল্লেখ্য, বিশাল দিঘী রামসাগরের দৈর্ঘ্য এটির চেয ১৫০ মিটার বেশি হলেও চওড়ায় ১৫০ মিটার কম। আর রামসাগর ১৭৫০ সালের দিকে খনন করা হয় কিন্তু আলতাদিঘী বৌদ্ধ যুগের দিঘী। আলতাদীঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান। শালবণ এবং বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদে পরিপূর্ণ ২৬৪.১২ হেক্টর জমির এই বনভূমিটি ২০১১ সালের ২৪ ডিসেম্বর প্রশাসনের নজরে আসে সাথে সাথে প্রাচীন ঐতিহ্যগত ইতিহাস পর্যালোচনায় এর গুরুত্ব অপরিসীম হয়ে ওঠে, আর একারণেই আলতাদীঘিকে ২০১১ সালে জাতীয় উদ্যান ঘোষনা করা হয়।

নওগাঁ শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার, জয়পুরহাট শহর থেকে মাত্র ১৯ কিঃমি। যেকোনো যানবাহনে খুব সহজেই পৌছা যায়।

দিঘীর পাড় ঘেষে বেড়ে ওঠা সু-বিশাল শালবনে সারি সারি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, বানর ছানার গাছে গাছে লাফানো আর জানা অজানা হাজারো পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে চারিদিক। বনের ভেতর দিয়ে পিচঢালা রাস্তা এঁকেবেঁকে চলেছে গন্তব্যে, রাস্তার দু’পাশে সারি সারি শাল গাছ, শুকনো শাল পাতার ফাঁকে বেড়ে ওঠা উইপোঁকার বড় বড় ঢিবি যা সত্যিই বিষ্ময়কর।

রাতের আঁধারকে আলোকিত করে যখন চাঁদের রুপালী আলো দিঘীর শান্ত পানিতে পরে তখন সেই আলোয় ছোট বড় মাছেরা খেলায় মেতে ওঠে, অপরদিকে শেয়াল, বেজি আর বনবিড়ালের আনাগোনায় নতুন রুপে আবিষ্কার হয় রাতের আলতাদিঘী ।

আলতাদিঘী আমাদের দেশের একটি অন্যতম পর্যটন এলাকা হতে পারে, তাই এর পরিবেশ সুন্দর রাখা আমাদের সবার দায়ীত্ব। বন বিভাগ ও একটি বেসরকারি সংস্থা-এনজিও দীঘি ও শালবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এগিয়ে এসেছে। ফলে বনাঞ্চলের বনভূমি নতুন করে আগের অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। বনাঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্টে পাহারাদার বসানো হয়েছে।

বনের মূল্যবান গাছপালা চুরি প্রতিরোধের জন্য বন থেকে শালপাতা সংগ্রহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটি এখন গহীন বনভূমিতে পরিণত হয়েছে। এ বনাঞ্চল এমনিতেই সৌন্দর্যময় এক ঐতিহাসিক নিদর্শনে প্রকৃতির আশির্বাদ। বনের মাঝে রয়েছে ঐতিহাসিক আলতাদীঘি যার দৈর্ঘ প্রায় এক কিলোমিটার। দীঘির পূর্ব-পশ্চিম এবং দক্ষীণে গহীন শালবন। আলতাদীঘির উত্তর ধারের বেশ কিছু অংশ ভারতে পড়েছে। এর ফলে দর্শনার্থী ও পর্যটকদের কাঁটাতারের বেড়া ও দু’দেশের আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার দেখার সৌভাগ্য হবে।

বনবিট কর্মকর্তা আ. মান্নান সময়ের আলোকে বলেন, জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পর ধামইরহাট উপজেলা সদর থেকে শালবন বনাঞ্চল ও আলতাদীঘি পর্যন্ত পাকা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে বাস, মাইক্রোবাস, ভটভটি ও রিক্সা-ভ্যান যোগে ধামইরহাট থেকে আলতাদীঘি পর্যন্ত চার-পাঁচ কিলোমিটার পথ অনায়াসে পাড়ি জমানো সম্ভব। প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা শাল বাগানে বন বিভাগের উদ্যোগে ইতোমধ্যে ঔষধিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা, বাঁশ ও বেত লাগিয়ে বন্যপ্রাণী ও পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।

এ বনাঞ্চলে অজগর, হুনুমান, বানর, গন্ধগোকুল, বেজি, সজারু, মেছোবাঘ, বনবিড়াল, শিয়ালসহ প্রায় ২০ প্রজাতির পাখি অবমুক্ত করা হয়েছে। এক দিকে পর্যটক ও দর্শকদের আনন্দ ও বিনোদন যেমন বেড়েছে তেমনি এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজার রাখার জন্য এ বনাঞ্চল যথেষ্ট অবদান রাখছে।

বর্তমানে দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন যানবাহন যোগে এ জাতীয় উদ্যান দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মানুষ। বিশেষ করে ঈদের পর দিন থেকে বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছুটে আসছে দীঘির সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য।

সুধীমহল মনেকরেন, প্রাচীন ঐতিহ্যে ভরপুর শালবনে ঘেরা আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যানের সঠিক ইতিহাস তুলেধরা এখন সময়ের দাবিতে পরিনত হয়েছে।