‘আলোর পথের মানুষ মুহস্মাদ নুরুন্নবী’: বেগম নূরজাহান নবী

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৮:২৪ পিএম, ৩ আগস্ট ২০১৯ শনিবার

লিখতে বসে ভাবছি, যাঁকে নিয়ে লিখবো আমার সাহস কোথায়? না জানি ভাষা, না জানি লেখার কোন কায়দা- কৌশল। চিরকাল আমি যে একজন আটপৌরে গৃহিণীই থেকে গেলাম! কোনদিন লেখার চেষ্টাও করি নাই। বই পড়েছি প্রচুর। শরৎ, বঙ্কিম, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ - যতো বই উনি এনে দিয়েছেন, সবই প্রায় পড়েছি।

কিশোরী বয়স পার করে যৌবনে পা দিয়েই মনে মনে একজন মানুষের ছবি এঁকেছিলাম। যখন শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাস পড়তে শুরু করি, তখনই আমার স্বপ্নের মানুষটি মনের ভিতর ধীরে ধীরে বেড়াতে উঠতে লাগলো। একজন সহজ - সরল মানুষ অথচ অসীম জ্ঞানের প্রদীপ আর যিনি পুরোপুরি ভাবে আমার উপর নির্ভরশীল।

আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। সত্যি আমার উপর সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। শিশুর মতো সরল ছিলেন তিনি। মা যেমন সন্তানকে একটু একটু করে গড়ে তোলে, আমিও তাঁকে খাউয়ে দিতাম, শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিতাম, মোজা - জুতা পরিয়ে দিতাম, টাই বেঁধে দিতাম। কত খুশি হতেন তিনি !

বই আর পড়া এই দুটি জিনিস নিয়েই ছিল তাঁর জগত। তিনি যখন লিখতেন, আমি পাশে বসে থাকতাম। উনি বলতেন," লেখার সময় তুমি পাশে থাকলে লেখাটা ভালো হয় নূরজাহান"! ওনার মতো ভাষার দখল আমার নাই, লেখালেখি তেমন করিও নাই কখনো। তবু মনে হয় তাঁকে নিয়ে লিখি একটু।
হয়তো তিনি খুশি হবেন।

বাচ্চু ভাই, বাদশা ভাইকে নিয়ে লিখলেন তিনি। রণেশ দাদা বেঁচে থাকতেই তাঁর জীবনী লিখলেন তিনি।আমি পাশে এলেই বলতেন, সবাইকে নিয়ে তো আমি লিখলাম, আমাকে নিয়ে কে লিখবে বলতো ? আমি শুধু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম, তাইতো কে লিখবে তাঁকে নিয়ে ? তাঁর উপর কলম ধরা তো আমাদের সাধ্যের বাইরে ।

আমাদের বিয়ে হয় ১৯৬৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর। উনি অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্র, আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী। সে সময়ের বাবারা এভাবেই বিয়ে দিতেন। মনে পড়ে সেই দিনের কথা। সকাল ৯.০০ টায় বিয়ে পড়ানো হলো, উনি ২.০০ টার বাস ধরে রাজশাহী চলে গেলেন। কেউ কাউকে চিনতেও পারলাম না, কোন কথাও হলো না ? চলে যাবার ঠিক ২০ থেকে ২৫ দিন পর আমার আব্বার কাছে একটা চিঠি আসলো। চিঠি খোলার কিছুক্ষণ পর আব্বা আমাকে ডেকে এক টুকরো কাগজ আমার হাতে দিয়ে বললেন, তোমার জন্য দোয়া পাঠিয়েছে, নাও পড়। আমি হাতে নিয়ে পড়লাম। সুরা আল আলাক এর কয়েকটি আয়াত। এই আমার জীবনে তাঁর দেয়া প্রথম আশীর্বাদ বা চিঠি। এভাবেই আমাদের সংসার যাত্রা শুরু হলো।

তাহেরপুর কলেজ থেকে তাঁর চাকরি জীবনে শুরু হয়। তবে বেশিদিন তাহেরপুর থাকেন নি তিনি। গনি ভাই মাস খানেক পরই তাঁকে পাবনা নিয়ে আসেন। এইবার শুরু হলো তাঁর প্রকৃত কর্ম জীবন। তৎকালীন ইসলামিয়া কলেজকে প্রতিষ্ঠিত করতে গনি ভাই আর তিনি উঠে পড়ে লাগলেন। পরবর্তীতে এই ইসলামিয়া কলেজকেই শহীদ বুলবুল কলেজ নামে নামকরণ করা হয়। তাঁর ধ্যান.জ্ঞান ,চিন্তা, চেতনা সবই ছিল এই কলেজকে ঘিরে।

বাসায় এসেই বসতেন বই নিয়ে। বিছানার চারপাশে থাকতো বই আর উনি থাকতেন মাঝখানে। খাবার কথাও ভুলে যেতেন। আমি কোন সময় এসে বলতাম, নামাজের সময় হয়েছে। তখন উনি নামাজ পড়তে উঠতেন। সেই ফাঁকে আমি খাবার থালা নিয়ে আসতাম। নামাজ শেষ হলে বলতাম, তুমি পড় আমি খাউয়ে দেই। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতাম ভাতের থালা নিয়ে, বই এর পাতা থেকে কখন মুখ তুলবেন সেই আশায়। পড়া ছাড়া কোন কিছুই তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারতো না। বাবা, মা, ভাই. বোন. ছেলে মেয়ে - সবার জন্য ছিল তাঁর অগাধ ও অকৃত্রিম ভালোবাসা। সবাইকে নিয়ে ভাবতেন তিনি।

তাঁর চিন্তা ভাবনা সবার থেকে আলাদা। তিনি বলতেন, নিজের কষ্ট বা দুঃখের কথা কাউকে বলতে নাই, এতে নিজের কষ্ট কমে না বরং অন্যকে যন্ত্রণা দেয়া হয়। তিনি নিজে এটা খুব মানতেন। কাউকে সহজে বলতেন না তাঁর অসুবিধার কথা। চলে যাবার একদিন আগে হঠাৎ আমাকে বললেন, দেখো, আমি তোমাকে কোন কষ্ট দিব না, শুধু তোমাকে কেন কাউকেই কোন কষ্ট দিব না। কোন সময়ও দিব না। তিনি তাঁর কথা রেখেছেন। কাউকে কষ্ট দেননি তিনি। সময়ও দেননি। নীরবে চলে গেছেন।

লেখক : বেগম নূরজাহান নবী, প্রয়াত প্রফেসর মুহাম্মদ নুরুন্নবীর সহধর্মিনী।