আশ্রয়ের খোঁজে দিশাহারা পাকশীর ৮ হাজার মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৬:১৪ পিএম, ২ ডিসেম্বর ২০১৯ সোমবার

রেলের বিভাগীয় শহর পাকশীতে উচ্ছেদ নোটিশ প্রদানের পর থেকে নতুন আশ্রয়ের খোঁজে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন প্রায় ৮ হাজার মানুষ। রেলের জমিতে ৭০-৮০ বছর ধরে বসবাসকারী পাকশীর ২২০০ পরিবারের প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থীর পড়ালেখা ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

মাত্র ১৫ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া নোটিশের সময়সীমার মধ্যে ৫ দিন ইতিমধ্যে গতকাল শেষ হয়েছে। বাকি ১০ দিনের মধ্যে বাড়ি-ঘর ভেঙে অন্যত্র চলে না গেলে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জরিমানাসহ উচ্ছেদ করা হবে পাকশীতে রেলের জমিতে বসবাসকারী এসব পরিবারকে।

এসব পরিবারের সদস্যরা একদিকে পাকা বাড়ি-ঘর ভেঙে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অন্যদিকে নতুন আশ্রয়ের খোঁজেও দিশেহারা পড়েছেন তারা। ঈশ্বরদীর পাকশী ইউনিয়নের বাঘইল, যুক্তিতলা, সাঁড়াগোপালপুরসহ আশেপাশের গ্রামগুলিতে বাসা ভাড়া নিতে এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি ছুটে বেড়াচ্ছেন এসব পরিবারের সদস্যরা।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা যাতে বন্ধ না হয় এবং আগামী ৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় যাতে প্রায় ১ হাজার শিশু শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করতে পারে সে বিবেচনায় গতকাল রোববার পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যাজোর (ডিআরএম) এর নিকট উচ্ছেদ স্থগিত রাখার জন্য লিখিত আবেদন করা হয়েছে।

সরেজমিন গতকাল রোববার পাকশীতে গিয়ে জানা গেছে, পাকশী রেলওয়ে সরকারী চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ, পাকশী রেলওয়ে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, পাকশী রেলওয়ে কলেজ, এমএস কলোনী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, হঠাৎপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, লিটল এঞ্জলস কিন্ডার গার্টেন, স্বর্ণকলি বিদ্যাসদন, পাকশী বিপিএড কলেজ ও বাঘইল স্কুল এন্ড কলেজ রয়েছে।

এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১১শ, মাধ্যমিক স্তরে ১৩শ, কলেজ পর্যায়ে ৪/৫শ’ সহ প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। যারা চলতি ডিসেম্বরে বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশগ্রহনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এরই মধ্যে উচ্ছেদের নোটিশে তাদের রাতের ঘুমও হারাম হয়েছে।

অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা জানান, হঠাৎ করে উচ্ছেদের নোটিশ পেয়ে এসব শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতি দুরে থাক বাড়ির জিনিস পত্র, বাড়ি-ঘর ভেঙে অন্যত্র যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করার কারনে তাদের পড়ালেখা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রেলের বাসায় অথবা রেলের জমি লীজ নিয়ে বাড়ি-ঘর করে বসবাসকারী এসব পরিবারের বেশিরভাগই ভূমিহীন, তাদের নিজস্ব কোন জমি-জমা না থাকায় অন্যত্র বাসা ভাড়া করার চিন্তা করছেন কিন্তু এক সঙ্গে ২ হাজারের বেশি সংখ্যক পরিবার আশেপাশে বাসা ভাড়াও পাচ্ছেননা।

পাকশীতে অবস্থিত ঈশ্বরদী ইপিজেডে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ও রেলওয়েতে কর্মরতসহ পাকশীর বাজার ও আশেপাশে ব্যবসা-বানিজ্য করা হাজার হাজার মানুষ এই এলাকার আশেপাশে ছাড়া দুরে বাসাও ভাড়া নিতে পারছেননা। আবার রেলওয়ের নিকট ৯৯ বছরের জন্য লীজগ্রহিতা বসবাসকারীরা পাকা দালান বাড়ি-ঘর করে বসবাসরত থেকে হঠাৎ উচ্ছেদ এর নোটিশ পেয়ে হতবাক হয়ে পড়েছেন।

পাকশী রেলওয়ে কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তফা ইমরুল কায়েস পারভেজ জানান, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা নিয়ে আমাদের কোন প্রশ্ন নেই তবে যারা বৈধভাবে জমি লিজ নিয়ে বহু বছর ধরে এখানে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন তাদের উচ্ছেদ করতে সময় না বাড়ালে শিক্ষার্থীদের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে, হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে হলেও উচ্ছেদ করার সময় বাড়ানো উচিৎ। 

পাকশীর বাসিন্দা রেজাউল করিম বাবু বলেন, ছেলেবেলা থেকে এই এলাকার বাসিন্দা আমরা, হঠাৎ উচ্ছেদের ঘোষণায় পরিবার পরিজন নিয়ে এত কম সময়ে কোথায় আশ্রয় পাবো তা ভাবতেই দিশেহারা হয়ে পড়েছি। এসএসসি পরীক্ষার্থী ইসরাত জাহান মিতু জানায়, সারা বছর পর ডিসেম্বরে লেখাপড়ার বর্ষ শেষ সময়ে বাড়ি-ঘর ভেঙে অন্য কোথাও যেতে হবে ভেবেই আমার পড়াশোনায় আর মন বসছেনা।

পরীক্ষার্থী শামিমা আক্তার সিনথি, মেহজাবিন হোসেন, তামান্না খাতুনসহ আরো বেশ কয়েকজন জানায়, এসএসসি পরীক্ষার আগে এভাবে বাড়ি-ঘর ভেঙে নিয়ে চলে যেতে হচ্ছে, তাদের সামনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করাও নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অভিভাবক শফিউল আলম জানান, ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা কিভাবে হবে বুঝতে পারছিনা। অভিভাবক মোঃ মোতাহার হোসেন, আফরোজা বেগম, মঞ্জুর আলম বলেন, আমাদের সন্তানের মত পাকশীর হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের লেখাপড়াও অনিশ্চিত হয়ে যাবে এই উচ্ছেদের কারনে।

পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মোঃ নুরুজ্জামান জানান, পাকশী এলাকায় রেলওয়ের কোয়ার্টার ও বাসায় বৈধ-অবৈধভাবে বসবাসকারী, রেলের জমিতে বাড়ি-ঘর তুলে ব্যবহার কারি এবং রেলের জমিতে চাষাবাদকারী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকান ইত্যাদী স্থাপনকারীদের ১৫ দিনের মধ্যে নিজ নিজ স্থাপনা ও মালামাল সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। রেলের বাসা খালি করে সকল বাসা পরিত্যাগ করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি কার্যালয় সূত্র জানায়, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রেলের এসব বাসা-বাড়ি, কোয়ার্টার ও জমি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের ফোর্সবেইজ তৈরীর জন্য সরকারের অন্য সংস্থার নিকট হস্তান্তর করা হবে। গত ২৬ নভেম্বর এই উচ্ছেদ নোটিশ জারি করে রেলের পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ভূ-সম্পত্তি কার্যালয়।

গতকাল রোববার পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার (ডিআরএম), উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পাকশী ইউনিয়ন পরিষদে পৃথক পৃথকভাবে এলাকাবাসী, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা লিখিত আবেদন করে এসএসসি, এইচএসসিসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় নির্বিঘেœ অংশগ্রহনের সুযোগ দিতে উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ করেছেন।

পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার (ডিআরএম) আসান উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, তাদের আবেদন আমরা রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট উচ্চ পর্যায়ে পাঠিয়েছি, সেখান থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আমাদের কিছুই করনীয় নেই।