করোনার ভয়াল থাবা: ধূমপায়ীদের জন্য অশনি সংকেত

আমজাদ হোসেন শিমুল

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৭:৩৯ পিএম, ৫ এপ্রিল ২০২০ রবিবার

আমজাদ হোসেন শিমুল।

আমজাদ হোসেন শিমুল।

হালে করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাস থামিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর স্বাভাবিক গতি। প্রতিদিনই যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। এক থেকে শুরু হয়ে মাত্র দুই-তিন মাসের ব্যবধানে বিশ্বে প্রায় ৬৪ হাজার ৭৪৪ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে করোনা। 

আর আজ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১২ লাখ ৩ হাজার ১৩০ জন। এভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার তরতাজা মানুষের প্রাণহানি বিশ্ববিবেককে করেছে নির্বাক। ক্ষণে ক্ষণে হাজারো মানুষকে পাকড়াও করায় আজ চরম আতঙ্কে ভুগছে পুরো বিশ্ব। 

এমন ভীতিকর পরিস্থিতিতে ধূমপায়ীদের জন্য করোনা নিয়ে এসেছে ভয়াবহ অশনি সংকেত। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, মরণব্যাধি এই করোনায় আক্রান্ত ধূমপায়ীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। আবার আক্রান্তদের মধ্যে যারা ধূমপায়ী তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি অধূমপায়ীর তুলনায় অনেক বেশি। 

চীনের এক জরিপে দেখা গেছে, করোনাভাইরাস সংক্রমিত প্রতি একশ’ জন পুরুষদের মধ্যে মৃত্যু হয় ২ দশমিক ৮ জনের। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে প্রতি ১০০ জন আক্রান্তের মধ্যে মারা গেছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ- অর্থাৎ অনেকটা কম। একই প্রবণতা দেখা গেছে ইতালিতেও। ইতালির স্বাস্থ্য গবেষণা এজেন্সি বলছে, কোভিড-১৯ এর মৃতদের ৭০ শতাংশই পুরুষ। এর পেছনে ধূমপান একটি বড় কারণ বলে মনে করছে সংস্থাটি।

আবার বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাও (হু) বলছে, যারা ধূমপান করেন তাদের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। এর কারণ সিগারেট সেবনের সময় হাতের আঙ্গুলগুলো ঠোঁটের সংস্পর্শে আসে এবং এর ফলে হাতে বা সিগারেটের গায়ে লেগে থাকা ভাইরাস মুখে চলে যেতে পারে। ধূমপায়ীদের মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার আগে থেকেই ফুসফুসের রোগ থাকতে পারে, অথবা ফুসফুসের কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে যা তার গুরুতর অসুস্থ হবার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়।

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রস অ্যাডহানম গেব্রেইয়েসুস করোনা থেকে বাঁচতে বিশ্ববাসীকে পাঁচটি পরামর্শ দিয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো ধূমপান পরিত্যাগ করা। নিজের জীবন বাঁচানোর তাগিদে যারা ধূমপান করেন তারা ধূমপান ছাড়ুন। তাই তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, করোনায় কখন কে আক্রান্ত হচ্ছি, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। আর জীবন তো একটাই। তার ওপর আবার ধূমপান করে নিজের অমূল্য জীবনটাকে আরও বেশি নিশ্চয়তার দিকে আমরা ঠেলে না দিই।

শুধু চীন কিংবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই নয়; পুরো বিশ্বের বিশেষজ্ঞরাই বলছেন, এই নিদেনকালে ধূমপান থেকে বিরত থাকার কথা। যুক্তরাজ্যে জনস্বাস্থ্য বিষয়ক দাতব্য সংস্থা অ্যাশ বলছে, যারা ধূমপান করেন তাদের উচিত করোনাভাইরাসের ঝুঁকি এড়াতে ধূমপান কমিয়ে ফেলা কিংবা পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া। 

ধূমপায়ীদের শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। তাদের নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যারা ধূমপান করেন না তাদের দ্বিগুণ। তাই করোনা ভাইরাসের কথা মাথায় রেখেই ধূমপায়ীদের উচিত এখনই ধূমপান ছেড়ে দেওয়া। এতে তার দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বেড়ে যাবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও বলছেন, ধূমপায়ী ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হলে তা থেকে কাটিয়ে ওঠা কষ্টকর। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস ফুসফুসে মারাত্মক প্রদাহ সৃষ্টি করে। ভাইরাসটি বয়স্কদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু যারা ধূমপান করেন এমন যেকোনো বয়সীদের জন্য করোনা ভাইরাস মারাত্মক ঝুকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। 

বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপানের যে ৭ হাজার রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে সেগুলো আমাদের শ্বাস-প্রশাসের মাধ্যমে ফুসফুসে যাচ্ছে। ফলে যদি করোনা ভাইরাস আক্রমণ করে তাহলে যারা ধূমপায়ী তাদের সংক্রমণের মাত্রা অধূমপায়ীদের তুলনায় ১০-২০ গুণ বেশি থাকে। তাই ধূমপায়ীদের করোনা ভাইরাস দ্রুত আক্রমণ করতে পারে এবং আক্রান্ত হওয়ার পর তাদের জটিলতার মাত্রাটাও দ্বিগুণ হতে পারে। 

যারা ধূমপায়ী তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, করোনার জন্য এখনো কোনো ভ্যাকসিন তৈরি হয়নি। এর একটাই ওষুধ সেটি হচ্ছে ঘরে অবস্থান করা। তাই বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বের মানুষ আজ ঘরবন্দি। আপনারা যারা ধূমপান করেন তারা কিন্তু ঘরের বাইরে নন! এজন্য আপনি যদি ঘরে অবস্থান করে ধূমপান করেন তাহলে ধূমপানের ধোঁয়ায় আপনার সন্তান, পরিবার প্রতিনিয়ত চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। তাই করোনাকালে নিজের এবং আপনার প্রিয় পরিবার তথা দেশের মানুষের দিকে তাকিয়ে পরিত্যাগ করুন ধূমপান। ক্ষতিকর এই নেশা থেকে আপনার জীবনকে রক্ষা করার এখনি উত্তম সময়। 

আমরা যদি একটু খেয়াল করি, সারাবিশ্বের মত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। করোনায় আক্রান্ত কিংবা করোনার উপসর্গ নিয়ে প্রায় প্রতিদিন মারা যাচ্ছে মানুষ। তবে চীন, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেনের মত আমাদের এই দেশে যাতে প্রাণঘাতী এই করোনা আঘাত হানতে না পারে সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। এজন্য সরকার দেশবাসীকে ঘরে অবস্থানের জন্য কঠোরভাবে মনিটরিং করছে। 

করোনা একটি বিশ্বযুদ্ধ। এই বিশ্বযুদ্ধে জয়ী হতে আমরা সবাই সবার অবস্থান থেকে যুদ্ধ করছি। আর ধূমপায়ীদের  উচিত, ধূমপান ছেড়ে দেয়ার মাধ্যমে ভয়াবহ এই বিশ্বযুদ্ধে শামিল হওয়া। এর মধ্যদিয়ে আপনি আপনার পরিবার, দেশ তথা বিশ্ববাসীকে করোনার ভয়াল থাবা থেকে বাঁচাতে পারবেন বলে বিশ্বাস করি। আপনাদের সবার সহযোগিতায় দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে ধূমপানমুক্ত হোক প্রিয় বাংলাদেশ এমনটাই প্রত্যাশা।