চীনা অর্থায়নের প্রকল্পগুলো যে অবস্থায়

নিউজ রাজশাহী ডেস্ক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৯:৫৯ এএম, ২৮ মার্চ ২০১৯ বৃহস্পতিবার

২০১৬ সালের অক্টোবরে দু’দিনের জন্য বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বাংলাদেশ সফর করা দ্বিতীয় চীনা প্রেসিডেন্টের সফরটিকে ঘিরে আগ্রহের কমতি ছিল না তখন। স্বাক্ষরিত হয় অনেকগুলো সমঝোতা স্মারক আর চুক্তিও। তবে এরপর প্রায় তিন বছর কেটে গেলেও এসব স্মারক আর চুক্তিগুলোর বেশিরভাগেরই বাস্তবায়নের গতি খুবই মন্থর। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাজ চলছে। ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে সব।

১৯৮৬ সালে প্রথম চীনা প্রেসিডেন্ট হিসেবে এদেশে এসেছিলেন লি শিয়ান ইয়ান। এর তিন দশকের মধ্যে আর কোনও চীনা রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সফর করেননি। ২০১৬ সালে দ্বিতীয় চীনা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শি জিনপিংয়ের এদেশ সফর তাই অনেক কারণেই ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তার সফরকালে দুই দেশের মধ্যে ২৭টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এরমধ্যে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা, বাংলাদেশ-চীন মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাই, অবকাঠামো, সেতু নির্মাণ, সমুদ্র সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ মোকাবিলা, উপকূলীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, দ্বিপক্ষীয় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আইসিটি খাত, সিল্করোড, জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতা, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল, সুয়ারেজ টার্মিনাল নির্মাণসহ সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সহযোগিতা ছিল উল্লেখযোগ্য।

২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর মধ্যে ১৫টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি হয়েছে দুই দেশের সরকার পর্যায়ে (জিটুজি)। বাকি ১২টি ঋণ চুক্তি ও সমঝোতা চুক্তি। এছাড়াও ইকোনোমিক ও টেকনিক্যাল কো-অপারেশন এবং রোড অ্যান্ড টানেলের ব্যাপারে একটা ফ্রেম ওয়ার্ক হয়েছে এবং আইসিটি ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এমনকি সেসময় যৌথভাবে ছয়টি প্রকল্পের উদ্বোধনও করেছেন দুই নেতা। প্রকল্পগুলো হলো- কর্ণফুলী নদীর নিচে একাধিক লেনের টানেল নির্মাণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ইনস্টিটিউট স্থাপন, চার স্তরের জাতীয় তথ্যভাণ্ডার, পটুয়াখালীর পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, চট্টগ্রামে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প ও শাহজালাল সার কারখানা নির্মাণ প্রকল্প। এরমধ্যে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ঘিরে বাংলাদেশ সরকারের আগ্রহ ছিল ব্যাপক।

চীনের প্রেসিডেন্টের সেই সফরের সময় সম্পাদিত চুক্তির মধ্যে একটি ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাব স্বাক্ষরিত হয়। একে সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ প্রস্তাব বলা হলেও এই চুক্তির পুরোপুরি বাস্তবায়ন সহজ হবে না বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটসহ (ক্রেতা বা সরবরাহকারীর ঋণ) চীনের দেওয়া বিভিন্ন শর্তের কথা।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, চীনা অর্থায়নের ৬ প্রকল্পের মধ্যে চট্টগ্রাম কর্ণফুলী ট্যানেল নির্মাণ প্রকল্প ও পটুয়াখালীর পায়রা সমুদ্র বন্দরের কাছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) জন্য ৬টি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া সম্প্রতি শেষ হয়েছে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি। এছাড়া অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায়নি। তবে ইআরডি বলছে, সব কিছুই প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রক্রিয়া শেষ হলে সব প্রকল্পের কাজ একযোগে চলবে।

আরও জানা গেছে, চীনের প্রেসিডেন্টের সেই সফরের সময় দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কিছু সহযোগিতা চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। এর আওতায় ২৮টি উন্নয়ন প্রকল্পে ২১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি সাহায্যের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া আট কোটি ৩০ লাখ ডলার অনুদানের জন্য অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা চুক্তি,কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি, দাশেরকান্দি পয়ঃনিষ্কাশন ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রকল্পের জন্য ২৮ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি এবং ছয়টি জাহাজ ক্রয় সম্পর্কিত মোট চারটি ঋণচুক্তি রয়েছে।

এর বাইরে চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ্যোগেও বিভিন্নখাতে সহযোগিতার লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, শুধু বেসরকারি খাতেই চীন বিনিয়োগ করবে ১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এছাড়া সরকারি পর্যায়ে আরও কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে।

সই হওয়া দুটি রূপরেখা চুক্তি হলো কর্ণফুলী নদীর নিচে একাধিক লেনের টানেল নির্মাণ ও দাশেরকান্দিতে সাগরকেন্দ্রিক ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। এই দুটি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য চারটি পৃথক ঋণচুক্তি সম্পাদিত হয়।

এছাড়াও সই হওয়া চারটি অর্থনৈতিক চুক্তি হলো-পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, চীনের জন্য বিশেষায়িত অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে প্রশস্তকরণ প্রকল্প, ব্রডকাস্টিং লাইসেন্স প্রটোকল চুক্তি।

আরও রয়েছে দ্বিস্তরের পাইপলাইনসমৃদ্ধ পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা এবং ডিপিডিসি এলাকা ও পাঁচটি টেলিভিশন স্টেশনের মধ্যে পাওয়ার সিস্টেম বর্ধিতকরণ চুক্তি।

চুক্তির এতোদিন পরেও সব প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়ার প্রসঙ্গে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান জানান, চীনের প্রেসিডেন্টের সফরের সময় সম্পাদিত বিনিয়োগ চুক্তিগুলো অনেক বড় মাপের। এগুলোর প্রক্রিয়া শেষ করে আনাটা অনেক সময় সাপেক্ষ। এজন্য কিছুটা সময় দিতেই হবে। আর চুক্তিগুলো তো আর একদিনে শেষ হয়ে যাবে না। এমন কোনও পরিকল্পনাও নাই। চুক্তি যখন হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হবেই।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গষেণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসিসি ডায়লগ (সিপিডি) এর বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘চুক্তির কতোটুকু বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করতে পারবে তা নির্ভর করছে বাংলাদেশের যোগ্যতা, দক্ষতা ও নীতির ওপর।’

এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘সব প্রকল্প এক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। তাই যে প্রকল্প যে মন্ত্রণালয়ের অধীনে, সেই মন্ত্রণালয় সেই কাজগুলো করছে। এগুলো তো একসঙ্গে দেখার কিছু নয়। কাজ চলছে। ধীরে ধীরে সব প্রকল্পই দৃশ্যমান হবে।’