টানা বৃষ্টিতে আউশ ধান নিয়ে বিপাকে রাজশাহীর কৃষকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৬:৩৭ পিএম, ২ অক্টোবর ২০১৯ বুধবার | আপডেট: ০৭:০৯ পিএম, ২ অক্টোবর ২০১৯ বুধবার

রাজশাহীতে ধান নিয়ে ফের বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। শ্রমিক সংকট, টানা বর্ষণ ও ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় গভীর সঙ্কটে পড়েছেন কৃষকরা। ফলে বারবার ক্ষতি কাটাতে জমি ভিটেমাটি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই। পেশা বদলের মতো ঘটনাও ঘটছে। অনেকে ধানের জমিতে অন্য ফসল চাষাবাদ করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর বোরো ধান নিয়ে লোকসানের শিকার হন কৃষকরা। ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় অনেকে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষক আউশ ধানের চাষাবাদ করেন। ইতোমধ্যে ধান কাটতেও শুরু করেছেন কৃষকরা। কিন্তু শ্রমিক সংকট, টানা বর্ষণ ও ধানের ন্যায্যমূল্য না থাকায় আবারও লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে কৃষকদের। এ নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে কৃষকদের মধ্যে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, এবছর জেলায় আউশ ধানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৯৪ হেক্টর জমিতে। ইতোমধ্যে ৩০ শতাংশ আউশ ধান কর্তন করা হয়েছে। টানা বর্ষণের কারণে ধান কাটা বন্ধ রয়েছে।

মোহনপুর প্রতিনিধি জানান, আউশ ধান নিয়ে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় রয়েছেন মোহনপুরের কৃষকরা। কৃষি অধ্যুষিত মোহনপুরে রকমারি ফসলের মতো প্রায় সাড়ে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চাষ করা হয়েছে বলে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র নিশ্চিত করেছে। কয়েক দিনের টানা বর্ষণসহ বাতাসে নুয়ে পড়েছে মাঠভর্তি খেতের ধান। মাঠে কাজ করা শ্রমিকের মূল্য বৃদ্ধি হলেও স্থানীয় বাজারে কমেছে নতুন ধানের দাম।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মোহনপুর উপজেলার সবস্থানেই ধান পেকে থাকলেও খেতেই পড়ে আছে আউশ ধান। বৃষ্টিবিঘ্নিত বৈরি আবহাওয়া ও শ্রমিক সংকটে মাঠেই ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। বেশিরভাগ খেতের ধান বাতাসে মাটিতে নুয়ে পড়েছে। একদিকে রয়েছে শ্রমিক সংকট অন্যদিকে চলছে কাটা মাড়াইয়ের সমস্যা। বোরো ধান বাড়িতে থাকার জন্য ভেজা আউশ ধান রাখার জায়গাও মিলছে না অধিকাংশ কৃষক পরিবারে। আবার শ্রমিকের মজুরি দিতে বাজারে ধান বিক্রি করতে পারছেন না কৃষকরা। এই সুযোগে মহাজনরা বাকিতে ধান কেনার পাঁয়তারা করছেন। এ ধরনের নানামুখি সমস্যার কথা জানিয়েছেন উপজেলার একাধিক কৃষক। বাজারে প্রতি মণ শুকনো ধান বিক্রি হচ্ছে যখন ৬০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকায় তখন একজন শ্রমিককে দুই বেলা খাবারসহ মজুরি দিতে হচ্ছে ৮০০ টাকা।

উপজেলার তিলাহারি গ্রামের কৃষক এনাম হোসেন জানান, চারদিক থেকে কৃষকরা যেন জিম্মি হয়ে পড়েছে। শ্রমিকসহ সকল পণ্য কিনতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে আর বাজারে ধান বিক্রি করতে গেলে দাম পাওয়া যাচ্ছে না। এমনিতেই ধানের ধান কম। এরপর মহাজনরা বাঁকি ছাড়া ধান কিনছেন না। এছাড়া রয়েছে খাজনা আদায়ে দমন নিপীড়ন। ৪০ কেজিতে মণের পরিবর্তে নেয়া হচ্ছে ৪২ কেজি থেকে ৪৪ কেজিতে মণ। প্রতি মণের খাজনা আদায় করা হচ্ছে ১০ টাকা। এধরনের নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কৃষকদের।

বাকশৈল গ্রামের কৃষক মাজেদুর রহমান বলেন, আউশ ধান পেকে গেছে কিন্তু বৃষ্টির কারণে কাটা সম্ভব হচ্ছে না। ভেজা ধান বাড়িতে রাখার জায়গা নেই। শ্রমিকের দাম অনেক।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ রহিমা খাতুন বলেন, আউশ ধান ভাল হয়েছে। ভাল ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টি বিঘ্নিত কারণে ধান কাটা-মাড়াই নিয়ে কিছুটা বেকায়দায় পড়েছেন কৃষকরা। তবে দ্রুত এসব সমস্যা কেটে যাবে বলে আশাবাদী তিনি।

তানোর প্রতিনিধি জানান, একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অপরদিকে উৎপাদন খরচ গিলে খাচ্ছে কৃষকের সব। গত দু’বছর ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে তানোর বিলকুমারী বিলের বোরো ধান ঘরে তুলতে পারেন নি কৃষক। রোপণ ও পরিচর্যা করে ধানে যখন পাক ধরে ঠিক সেই সময়ে ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে শিবনদ বা বিলকুমারী বিল ফুলে ফেঁপে উঠে। ফলে কৃষকের কষ্টে রোপিত বোরো ধানের খেত ডুবে যায়। এভাবে দু’বছর ধরে বোরো ও আউশ আমনের খেত ডুবছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর উপজেলায় আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। এছাড়া আউশ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে। গত ২০১৬-২০১৭ অর্থবছর হতে চলতি অর্থবছর পর্যন্ত এই লক্ষ্যমাত্রা বহাল রয়েছে।

উপজেলা খাদ্য অফিস থেকে জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমে সরকার ২৬ টাকা কেজি দরে ধান ক্রয়ের রেট বেঁধে দেন। প্রকৃত কৃষকের কাছে ও খোলাহাট-বাজারে এ ধান ক্রয় করার কথা। কিন্তু এসব ধান কৃষকের পরিবর্তে দেন ওসি এলএসডির আস্থাভাজনরা ।

ফলে, কৃষকরা দিশেহারা হয়ে সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ না পেয়ে সংসারের চাহিদা মেটাতে ২৬ টাকা কেজির ধান খোলা বাজারে ১৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। এভাবে কৃষকের পরিবর্তে তানোর খাদ্যগুদামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান কিনছেন ওসিএলএসডি। ফলে নিরূপায় কৃষক দিশেহারা হয়ে খোলাবাজারে পানির দরে ধান বিক্রি করছেন।

কৃষকের হিসাবমতে, প্রতি বিঘায় ধান উৎপাদন খরচ হয় ৭ হাজার ৫০০ টাকার ওপরে। এতটাকা খরচ করে কেজির ওজনে প্রতিবিঘায় ধান উৎপাদন হয় ১৫ মণ। কিন্তু লেবার খরচ ও ধানে সার বিষ দিতে উৎপাদিত ধানের অর্ধেক চলে যায়।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বন্যার পানি নেমে যাবার পর তানোর উপজেলার উত্তরে চৌবাড়িয়া ব্রিজ থেকে দক্ষিণে চাঁন্দুড়িয়া চকিরঘাট ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৮ হাজার হেক্টর কৃষি জমিতে কৃষকরা রোবো ধান রোপণ করেন। প্রতি বছরের মতো চলতি মৌসুমে বোরো ও আউশ আমনের ধান চাষাবাদ করেন কৃষক। কিন্তু ধানে যখন পাক ধরে ভারি বর্ষণে ডুবে যায়।

উপজেলার কামারগাঁ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোসলেম উদ্দিন প্রামানিক জানান, দেড় মাস আগে একবার শিবনদের বন্যা হয়। ওই বন্যায় তার এলাকার চার থেকে পাঁচশ একর আমন খেত তলিয়ে যায়। বন্যার পানি নেমে যাবার পর এসব জমিতে দ্বিতীয়বারের মত আমন ধানের চারা রোপণ করা হয়। কিন্তু সর্বনাশা বন্যা এবারও আমনের খেত খেয়ে নেয়।

তার অঞ্চলের কৃষকরা অর্থ ও শ্রম দিয়ে শিবনদের পাশে আমন ও আউশের খেত দ্বিতীয়বারের মত রোপণ করেছেন। এখন রোপিত এসব ধান ডুবতে বসেছে। এজন্য কৃষকের হয়ে সরকারি সাহায্যের দাবি জানান তিনি।

তবে, এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামিমুল ইসলাম বলছেন, বিলকুমারী বিল তথা শিবনদ সংলগ্ন এলাকার ৪ থেকে ৫০০ বিঘা জমির রোপিত আমন খেত ডুবেছে। এর বেশি নয়। কিন্তু গত দু’বছর ধরে নিম্নাঞ্চলের কৃষকদের বোরো খেত ডুবছে। এটা দুঃখজনক। কিন্তু শিবনদের বুকে জেগে উঠা জমিতে আমন ধানের চারা রোপন করা কৃষকের খামখেয়ালিপনা বলে জানান তিনি।