তানোরে বাড়ছে ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৫:৪৯ পিএম, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ শুক্রবার

রাজশাহীর তানোর উপজেলার শিবনদীর বিলকুমারি বিলের পাড়ের অনেক স্থানেই দেখা মিলবে ঝাঁকে ঝাঁকে হাঁস চরে বেড়াচ্ছে। একসঙ্গে এত হাঁস দেখে প্রথমে অতিথি পাখি ভেবে কেউ ভুল করে বসতে পারেন। একটু ভালো করে খেয়াল করলেই দেখা যাবে, একাধিক ব্যক্তি গরুর রাখালের মতো হাঁসের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করছেন। খাল-বিল-জলাশয়ে প্রচুর খাবার মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে সেখানে তাঁরা হাঁস নিয়ে এসেছেন চরানোর জন্য।

সারা দিন হাঁস চরিয়ে রাতের বেলা অস্থায়ীভাবে তৈরি ঘেরে হাঁসগুলো নিয়ে তাঁরা থাকছেন। কয়েক দিন পর খাবারের সন্ধানে হাঁসের পাল নিয়ে চলে যাচ্ছেন অন্য এলাকায়। এভাবে ঘুরেঘুরে হাঁস পালনে খাবারের খরচ নেই। লাভজনক হওয়ায় এই পদ্ধতিতে হাঁস পালনে আগ্রহীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে। আর এ কারণেই তানোরে বিভিন্ন স্থানে দেখা মিলছে এমন ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার।

যে পদ্ধতিতে চলছে: মূলত ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যেই গড়ে তোলা হয় এ ধরনের খামার। সাধারণত প্রতিটি খামারে তিন থেকে ছয় শ হাঁস থাকে। প্রতিটি খামারের দেখভালের জন্য থাকে এক-দুইজন লোক। বর্ষার সময় খাল-বিল ডুবে থাকায় খামারিরা নিজেদের বাড়িতেই হাঁসগুলো লালন-পালন করেন। এ সময়ে খামারিদের লাভ হয় কম। কারণ তখন হাঁসগুলোকে পুরো খাবার যেমন কিনে খাওয়াতে হয়, তেমনি বদ্ধ পরিবেশের কারণে সেগুলোর ডিম দেওয়ার ক্ষমতাও কমে যায়। বর্ষার পানি কিছুটা কমতে না কমতেই খামারিরা বেরিয়ে পড়েন তাঁদের হাঁসগুলো নিয়ে।

লাভ বেশি: খামারিরা জানান, সাধারণ খামারগুলোতে হাঁসের খাবারের পেছনেই লাভের বড় একটা অংশ চলে যায়। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ খামারের ক্ষেত্রে তা হয় না। বিলকুমারির বিলে পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যায় বলে ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় সেগুলোর জন্য খাবার প্রায় কিনতেই হয় না। এ ছাড়া উন্মুক্ত পরিবেশ ও প্রাকৃতিক খাবার পেয়ে সেগুলোর ডিম দেওয়াও বেড়ে যায় বেশ। এ কারণে সাধারণ হাঁসের খামারের চেয়ে ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামারে লাভ অনেক বেশি।

খামারিদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সাধারণ খামারের চেয়ে ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামারে বিনিয়োগ করতে হয় তুলনামূলকভাবে কম। ভ্রাম্যমাণ খামারে অবকাঠামো-ব্যয় নেই বললেই চলে। হাঁস কেনা বাবদ যা ব্যয় হয় সেটিকেই মূল বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। ৫০০ হাঁস আছে এমন একটি খামারে হাঁসের পেছনে বিনিয়োগ প্রায় সোয়া লাখ টাকা (প্রতিটি গড়ে ২৫০ টাকা হিসেবে)। এ ছাড়া অন্যান্য খাতে সবমিলিয়ে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ পাঁচ হাজার টাকা। ৫০০ হাঁসের একটি ভ্রাম্যমাণ খামারে প্রতিদিন গড়ে ৪০০টি ডিম উৎপাদন হয়। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এর দাম প্রায় তিন হাজার টাকা। এতে এমন একটি খামারে খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন কমপক্ষে আড়াই হাজার টাকা আয় থাকে।

স্বাবলম্বী অনেকেই: বছর চারেক আগেও তানোর পৌরশহরের বেলাল আহম্মেদ (৩৭) ছিলেন দিনমজুর। সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনির পরও শ খানেক টাকা নিয়ে ঘরে ফিরতে পারতেন না। অন্যদের দেখে ভ্রাম্যমাণ খামার করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। বেসরকারি সংস্থা ও আত্মীয়ের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে গ্রামেরই আরও দুজনের সঙ্গে মিলে অংশীদারির ভিত্তিতে ২৫০ হাঁস নিয়ে শুরু করেন ভ্রাম্যমাণ খামার। ইতিমধ্যেই সব ঋণ শোধ করে বেশকিছু টাকা সঞ্চয় করেছেন তিনি। গত বছর থেকে তিনি একক মালিকানায় খামারও দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার সংসারে এখন কোন অভাব নাই। হাঁসের খামারই আমার ভাগ্য বদলায়ে দিয়েছে।’

উপজেলা পশুসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. আহসান হাবিব বলেন, ‘অসুখ-বিসুখ কম হয় বলে হাঁস পালন এমনিতেই লাভজনক। এর ওপর ভ্রাম্যমাণ পদ্ধতিতে বিনা পয়সায় হাঁসগুলোকে খাওয়ানো যায় বলে তা স্বাভাবিক খামারের চেয়ে বেশি লাভজনক। এ কারণে এই এলাকায় ভ্রাম্যমাণ পদ্ধতিতে হাঁস চাষ দ্রুত বেড়ে চলেছে।

তানোর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আবু বাক্কার বলেন, ‘বিলকুমারির বিলে কয়েক বছর ধরে হাঁস নিয়ে দলে দলে খামারিরা আসছেন। দেখে খুব ভালো লাগে। মনে হয়, শীতের পাখির মেলা বসেছে।’