তিনি পরকীয়া করতেন

ডা. মুসাদ্দিকুন নাহার শুকরিয়া

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৮:৫৪ পিএম, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বুধবার | আপডেট: ০৯:০৪ পিএম, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বুধবার

ডা. মুসাদ্দিকুন নাহার শুকরিয়া

ডা. মুসাদ্দিকুন নাহার শুকরিয়া

মা তোমার আঁচলটা সরাও, খোপার গোছাটা দেখাও দেখি. নামায জানো? কোরাআন পড়তে পারো? খতম দিয়েছো কি? আচ্ছা, চতুর্থ কলেমাটা বলোতো... কি কি রাঁধতে জানো? পায়েস রাঁধতে কি কি লাগে বলতে পারবে? সেলাইয়ের কাজ টুকিটাকি জানা আছে? শার্টের বোতামটা ছিড়ে গেলে লাগাতে পারবে?

প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে ছেলের দাদী বলে উঠলেন, এবার একটু হেঁটে দেখাওতো বোন!

আমি বলে উঠি, দাদী ঐ আপুটা হাটতে পারেন। তিনি তো পায়ে হেঁটেই আমাদের সামনে এসে বসলেন! সবাই বিরক্তির চোখে তাকালে নানী ইশারায় আমায় চুপ করে দিলেন। সালটা ছিলো ২০০৪। আমি তখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী। নানীর সাথে কমলাপুর গিয়েছিলাম প্রতিবেশী এক ভাইয়ের পাত্রী দেখতে।

পৌষের কুয়াশা ভেদ করে পৌছেছিলাম সেখানে। হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যেও সেই আপু একটা লাল শাড়ি পড়ে বসেছিলেন। গায়ে কোন সোয়েটার কিংবা চাদরও ছিলোনা। কারণ ছেলের মা বলেছিলেন বলে।

অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ছেলের মায়ের পছন্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেন। এক নম্বর মেয়ে পাওয়াতে ছেলের পরিবারও খুশি। সেই সুবাদে নামমাত্র যৌতুকের (২ভরি স্বর্ণ সাথে ৮০ হাজার টাকা) বিনিময়ে বিয়ের পাকা কথা হয়। শীত পেরিয়ে বসন্তে বিয়ে। আপু থেকে ভাবি ডাক পেলেন আমার থেকে।

উনার নাম ছিলো মুক্তা। তিনি তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। কি কারণে জানিনা তার সাথে আমার সম্পর্কটা ছিলো সমবয়সী বন্ধুর মত। একান্ত ব্যক্তিগত কথা ছাড়া বেশিরভাগ কথাই আমার সাথে শেয়ার করতেন। শ্বশুরবাড়ির কারো বিরুদ্ধে কখনো অভিযোগ করতে শুনিনি তার কাছে। ভাইয়া নাকি তাকে অনেক ভালোবাসতেন। তার কাজকর্মের প্রশংসাও করতেন। আর করবে নাইবা কেন! লক্ষীমন্ত মেয়ে সে শতগুণের অধিকারিনী।

বিয়ের পরের বছরই এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করলেন। সেবছরই তার বাবা মারা যান। তারপর পড়াশোনা আর এগোয়নি। সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ২ ছেলের মা হয়ে গেলেন। এরপর আমাদের দেখা হওয়াটা কমে আসে। আগের মত দেখা হত না। আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম পড়াশোনা নিয়ে। তবে মাঝেমাঝে কথা হত আমাদের। হঠাৎ একদিন তিনি এলেন আমার কাছে। দেখি তার অনেক পরিবর্তন। সুন্দর চেহারাটায় পড়েছে বয়সের ছাপ। চোখের নিচে কালচেভাব। মুখ গুরুগম্ভীর।

কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই চোখ ছলছল করে উঠে তার। গাল বেয়ে চোখের পানি পড়ে কিন্তু মুখে রা সরেনা। একপর্যায়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। আমিও জড়িয়ে রাখি তাকে। অনেকক্ষণ পর স্বাভাবিক হলে জানতে পারলাম সে ভাইয়া নাকি নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। একই এলাকারই এক মেয়ের সাথে। আমি শুনে হতভম্ব, এও হতে পারে! এত সুন্দর বউ রেখে কেউ কিভাবে পারে অসুন্দর, বয়সে বড় এক নারীর সাথে পরিণয়ে জড়াতে? আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম সেদিন।

বলেছিলাম ভাবি এটা আপনার অমূলক সন্দেহ। সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। ধৈর্য্য ধরুন। ভাবি ধৈর্য্য ধরে ভাইয়ার সুপথে আসার অপেক্ষা করেন কিন্তু ভাইয়ার মন যে পরনারীর কাছে। যে পাখি মেলেছে ডানা সে কি আর ফেরত আসে? অবশেষে ভাবি তার মায়ের থেকে কিছু টাকা এনে ভাইয়াকে ঢাকায় পাঠায় ব্যবসা করার জন্য। একটাই আশা যদি দূরে গিয়ে সেই নারীকে ভুলে যায়! এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকে।

ভাইয়া যোগাযোগ রাখতো, নিয়মিত বাসায় টাকাও পাঠাতো। ভাবির আবারো প্রাণোচ্ছল হয়ে ওঠেন। কান্না রূপান্তরিত হয় হাসিতে। কয়েকমাস পর যোগাযোগ কমতে থাকে, এরও কয়েকমাস পর টাকাও আর আসেনা তার কাছে। সংসারে টাকা দিতে না পারায় শ্বশুর বাড়িতেও অশান্তি পোহাতে হয় তাকে।

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই জানা যায় ভাইয়ার ২য় বিয়ের কথা।

জনপূর্ণ এ পৃথিবীতে তখন তার পাশে কেউ ছিলোনা। সবাই কথা শোনাত তাকেই। বলতো অলক্ষী, নিজের বরকে আগলে রাখতে পারেনা, সংসার বিধ্বংসী...ভাবি শোনেন আর ধৈর্য্য ধরেন যদি তার স্বামীর ভুল ভাঙে কখনো। সময় যায় অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হয়না।

বিজ্ঞজনেরা বলেন, ধৈর্য্য ধরে থাক কি করবি তোর পড়া কপাল সতীনেরই সংসার কর। ভাবি আপোষ করেননি। সিদ্ধান্ত নেন ডিভোর্সের! যাবার আগে একদিন শেষ দেখা করতে এসেছিলেন আমার কাছে। আমি বলেছিলাম, ভাবি আর একটু ধৈর্য্য ধরলে হতো না? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছিলেন, দুবছর ধৈর্য্যের উপরে আছি আর কত বলতে পারো! এ ধৈর্য্যের শেষ কোথায়? শুধু মেয়েদেরই কেন ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে হবে? আমি এই মানসিক নির্যাতন আর নিতে পারছিনা। আমি চলেই যাবো। এই সমাজে পুরুষেরা বহুবিবাহ করে, পরকীয়া করে আর মেয়েদের বলা হয় তোমরা ধৈর্য্য ধারণ করো। ছেলেদের উড়ু মন তারা উড়বেই তুমি পারলে তাদের ঘরে ফেরাও নয়ত মুখ বুজে সংসারে মন দাও।

যদি এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর, রুখে দাড়াও অথবা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নাও তবে তুমি অলক্ষী, অসতী, নষ্টা।

তার কথাগুলো বড় বেশি বাস্তব ছিলো। এবং ঘটেছিলও তাই। তিনি চলে যাওয়ার পর অনেকেই বলেছিল তিনি পরকীয়া করতেন তার টানেই ঘর ছাড়লেন!