তিল বিড়ম্বনা

মুসাদ্দিকুন নাহার শুকরিয়া

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৯:৩৪ পিএম, ১২ মার্চ ২০১৯ মঙ্গলবার

মুসাদ্দিকুন নাহার শুকরিয়া।

মুসাদ্দিকুন নাহার শুকরিয়া।

বিংশ শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে জন্ম আমার। সেসময়টা আধুনিক যুগের অন্তর্ভুক্ত হলেও খুব বেশি প্রযুক্তি নির্ভর ছিলোনা মানুষ। ছিলোনা কোন ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, ট্যাব, রঙিন টিভি। তবে সাদাকালো টিভি ছিলো। আর সে টিভিতে প্রতি শুক্রবার শাবানা-জসিম, শাবনূর-রিয়াজ, মৌসুমি-ইলিয়াস কাঞ্চনেরা নাচানাচি করতেন এবং আবেগের উদ্রেক করতেন আমাদের মধ্যে।

আমাদের বাড়ির সকলের এবং আমার প্রিয় নায়িকা ছিলেন শাবানা। তার কারণ একটাই উনার ডান গালের তিল। সেই সময় সকল মেয়েদের একটাই সুপ্তবাসনা ছিলো শাবানার মত একটা তিল। যাদের সত্যি সত্যি তিল গজিয়ে যেত তাদের ভাবে মাটিতে পা পড়তো না। আর যাদের হতনা তারা আর্টিফিসিয়াল তিল লাগিয়ে নিতেন মানে কাজল দিয়ে! হুম এই তিল নিয়েই আছে কিছু টুকরো স্মৃতি।

স্মৃতি- ১: খুব ছোটবেলা মানে চার-পাঁচ বছর হবে হয়ত। সেই সময়টায় আমি খুব সাজুগুজু করতে পছন্দ করতাম। বড়দের নকল করতাম। তারা ঠিক যতটুকু সাজবেন আমাকে ঠিক ততটাই সাজিয়ে দিতে হবে নয়ত কান্না জুড়ে দিতাম। সে সময়কার সাজগোজ বলতে মুখে ক্রিম-পাউডার, চোখে কাজল, ঠোটে গাঢ় লিপস্টিক আর কপালের টিপ। এখনকার মত আটা-ময়দা-সুজি টাইপ ভারি মেকাপ না।

যাই হোক আমি সবসময় আমার বড় খালামনির কাছে সাজতাম। খালামণি আমাকে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দিলে আমি খুশি হয়ে খালামনিকে বলতাম, ‘বড় হয়ে আমি যখন চাকরি করবো তখন তোমাকে একটা শাড়ি, একটা ব্লাউজ আর একটা লিপস্টিক কিনে দিবো।’

বড়খালামনি আমার কথায় তখন খুব খুশি হতেন। একদিন আমার মা আর দুই খালামণি বেড়াতে গিয়েছিলাম কোন এক আত্মীয়ের বাসায়। বরাবরের মতই খালামণি যতটুকু সেজেছিলেন আমিও ঠিক ততটুকুই সেজেছিলাম সেদিন। কিন্তু আত্মীয়ের বাড়ি গিয়ে হঠাত লক্ষ্য করলাম খালামণির ডান গালে একটা তিল ঠিক যেন নায়িকা শাবানার মতো। আমি কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলাম না যে বাসায় থাকাকালীন তো গালে তিল ছিলোনা, কয়েক ঘন্টায় কি করে তিল গজিয়ে গেলো? আমার ছোট্ট মগজ ইতিউতি করে উত্তর খুঁজে না পেয়ে সকলের সামনে জিজ্ঞেস করে বসলাম, ‘খালামণি তোমার গালে তিল কিভাবে উঠলো? বাসায় থাকতে তো ছিলোনা! শাবানার তিল কি চাইলেই ওঠানো যায়’

খালামণি অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন। এর সাথে সাথেই আমাকে কাছে ডেকে নিলেন এবং কানে কানে বললেন, ‘তুমি যদি এখন চুপচাপ থাকো আর কোনো প্রশ্ন না করো তাহলে তোমার গালেও শাবানার তিল উঠব’ আমি খুশিতে চুপ করে গিয়েছিলাম। বছরের পর বছর অপেক্ষা করলাম কিন্তু তিল আর উঠলোনা!

স্মৃতি- ২: বছর দুয়েক পর। আমি তখন পুলিশ লাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২য় শ্রেণিতে পড়ি।শাবানার তিল ডান গালে না উঠে একটু নিচে নেমে ডান ঠোঁটের কোণে গিয়ে স্থির হল। তিলের উপস্থিতি টের পেয়েছিলাম একটা ঘটনার মধ্য দিয়ে। এই তিল নিয়ে আমি পড়েছিলাম বিড়ম্বনায়। প্রকৃতির নিয়ম বলে কথা, অন্যকে বিড়ম্বনায় ফেললে একদিন নিজেকেও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়!

সেদিন সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা ছিলো। শেষের ক্লাসটা ছিলো রহিমা ম্যাডামের। ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকতেই আকাশ কালো হয়ে এলো, মেঘদের পাল্লা দিয়ে ডাকাডাকি শুরু হল। আমরা সকলেই মনে মনে খুশি হলাম কিন্তু মুখ ভয়ার্ত করে ম্যাডামকে বললাম, ম্যাডাম মনে হচ্ছে খুব ঝড় হবে, এমন অবস্থায় ক্লাস করা যাবেনা ম্যাডাম, ছুটি দিয়ে দিন না প্লিজ ম্যাডা’।

ম্যাডামও আবহাওয়া লক্ষ্য করে বললেন, আচ্ছা ক্লাস আমি নেবোনা। কিন্তু শর্ত আছে। আর তা হলো, তোমরা কেউই এখন বাড়ি যেতে পারবেনা কারণ কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে। আর ক্লাস থেকেও বের হতে পারবেনা, তোমাদের হেড স্যার দেখলে খুব বকবে। সবাই ক্লাসে ব্রেঞ্চে মাথা দিয়ে চুপচাপ থাক’ বলেই ম্যাডাম বেরিয়ে গেলেন। রাগী ম্যাডামের ক্লাস হবেনা বলে আমরা বেঁচে গেলাম এবং তারচেয়ে ভয়ংকর রাগী হেড স্যারের ভয়ে আমরা ফিসফিসিয়ে কথা বলছিলাম। আমি সমেত আমার বান্ধবীরা সবসময়ের মতই প্রথম ব্রেঞ্চে বসেছিলাম। আমাদের মুখোমুখি ছেলেদের দিকের প্রথম ব্রেঞ্চে বসেছিলো আমার বন্ধুরূপী প্রতিদ্বন্দ্বী জসিম, শামীম এবং সাজ্জাদ। তাদের পেছনে সবুজ, সুজন এবং আরও কয়েকজন।

হঠাত আমাদের ক্লাসের ২য় ক্যাপ্টেন মানে জসিম দাড়িয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলল, আমাদের সহপাঠী সবুজ সকলের উদ্দেশ্যে কিছু বলবে। সাধারণত ক্লাসের ক্যাপ্টেনরা ছাড়া অন্যান্যদের সরাসরি কিছু বলার অধিকার নেই নিয়মের বিপরীত হওয়ায় তাই সকলেই হেসে উঠেছিলো। ক্লাসে হট্টগোল শুরু হয়ে যাওয়াও সবুজ নামের ছেলেটি দাড়িয়ে গিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলা শুরু করলো, দেখ্ আমি প্রথম এবং শেষবারের মত একটা কথা বলতে চাই, তোরা চুপ কর প্লিজ। আমরা সবাই শান্ত হয়ে গিয়েছিলাম।

অতপর সে বললো, ‘আমি এই ক্লাসের একজনকে ভালোবাসি, তার ডান ঠোঁটের কোণে একটা তিল আছে।’ আমরা সকলেই হো হো করে হেসে উঠেছিলাম। অতি উত্সাহী কয়েকজন জিজ্ঞেস করলো, নাম কি? সে বললো নাম বলবোনা তোরা খুঁজে নে। আমি আর আমার বান্ধবী লিজা জসিমকে ইঙ্গিত করে বললাম, জসিমের তিল আছে। জসিম উল্টে আমাকে ইঙ্গিত করে বললো তোরও তিল আছে। সবাই হা হা করে আমার কাছে ছুটে আসলো ওর কথার সত্যতা প্রমাণ করতে। বলাবাহুল্য আমি তখন নিজেই জানতাম না আমার ঠোঁটের কোণে তিল আছে!

সবাই আমাকে চিড়িয়াখানার বাদঁর দেখার মত দেখতে দেখতে বললো ঠিক ধরেছিস জসিম ঠিক ধরেছিস!আমার তখন ধরণি তুমি দ্বিধা হও টাইপ অবস্থা। (তখনকার দিনে কেউ প্রোপোজ করলে মনের মাঝে শতশত রঙিন প্রজাপতি উড়াউড়ি করতোনা। কেবল অপমানে গাল-কান দুটোই লাল হয়ে যেত, আর প্রতিশোধের আগুন বুকে জ্বলে উঠতো)।

সেদিন কোনমতে বাড়ি ফিরেই আয়না নিয়ে বসেছিলাম। দেখি সত্যি সত্যি আমার তিল আছে। আমি আঙুল দিয়ে ডলতে থাকলাম। ভেবেছিলাম কাল স্কুলে যাবার আগেই এটাকে তুলে ফেলবো। কিন্তু তিল আর উঠে যায়নি তবে তিল সংলগ্ন গালের চামড়া উঠে গিয়েছিল।

পুনশ্চ: ক্লাসের ফার্স্ট ক্যাপ্টেনকে ভালোবাসার অপরাধে ক্লাসের সবার সামনে সবুজ পরে ক্ষমা চেয়েছিল।আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। চাইলে আমি হেডস্যার মানে আমার নানুভাইকে বলে তাকে গুরু শাস্তি দিতে পারতাম। আমি তা করিনি। কারণ, আমি অনেক দয়ালু কিনা!