দেশ ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে লোকগানের মুগ্ধতা: অঞ্জন চৌধুরী

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৫:২১ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০১৯ শুক্রবার

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু। ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্কয়ার টয়লেট্রিজ ও মাছরাঙা টেলিভিশন এবং পরিচালক স্কয়ার গ্রুপ। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী `ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৯`। লোকসংগীতের এই উৎসবের আয়োজক তিনি। এ আয়োজন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমাদের সহকর্মী এবিএম ফজলুর রহমান তা হুবহু তুলে ধরেছেন। 

`ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৯`-এর আয়োজনে বিশেষ কী থাকছে?

এই নিয়ে পঞ্চমবারের মতো আয়োজিত হচ্ছে `ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট`। প্রতিবারই যে-রকম হয়- বাংলাদেশের শিল্পীদের পাশাপাশি বিশ্বের নতুন নতুন শিল্পীর সঙ্গে এ দেশের দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেই। এটাই এর বিশেষত্ব। আমাদের এই আয়োজনে কিছু পুরোনো শিল্পীর পাশাপাশি নতুন শিল্পীরা পারফর্ম করেন। এবারও বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের জনপ্রিয় লোকসংগীতশিল্পীদের সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় ঘটবে।

টানা পঞ্চমবারের মতো এই আয়োজন করতে পেরে কেমন লাগছে?

ধারাবাহিকভাবে এই আয়োজন করতে পেরে আমরা খুবই খুশি। পাশাপাশি কৃতজ্ঞ দেশের আপামর দর্শক-শ্রোতা থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের প্রতি। আয়োজনটি করতে গিয়ে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সব জায়গা থেকেই আমি যতটা সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছি, তা অকল্পনীয়। এই সহযোগিতা না পেলে এমন আয়োজন কখনোই করা সম্ভব হতো না। প্রথমেই বলতে চাই, আর্মি স্টেডিয়ামের কথা। আন্তর্জাতিক শিল্পীদের নিয়ে এ ধরনের আয়োজনের জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো জায়গা। আমি সবসময়ই আর্মি স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ ও সেনাপ্রধানের প্রতি কৃতজ্ঞ। তারা এই আয়োজনটি করার জন্য অনুমতি দিচ্ছেন। তারা এমন আয়োজনের অনুমতি দিয়ে দেশের লোকসংগীতের প্রসারে কতটা ভূমিকা পালন করছেন, তা হয়তো নিজেরাই তা জানেন না; কিন্তু আমি উপলব্ধি করতে পারি। আর আমাদের মাথার ওপর আছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি সবসময় আমাদের সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্যই কাজ করে যাচ্ছেন।

এবারের আয়োজন নিয়ে আপনার চাওয়া কী?

প্রতি বছরই আয়োজনের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত আয়োজনে যে ভুলত্রুটি হয়েছিল, এবার যেন সেগুলো কাটিয়ে ওঠে দর্শকদের সুষ্ঠু ও সুন্দর একটি অনুষ্ঠান উপহার দিতে পারি। বাংলাদেশের আরেকটি সাফল্য যেন তুলে ধরতে পারি এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমি আশা করছি, দর্শকরা খুব শান্তিপূর্ণভাবে এ আয়োজনে অংশ নেবেন, দেশ-বিদেশের শিল্পীদের লোকগান শুনবেন। দেশের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতায় গত চারবার সফলভাবে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পেরেছি। আশা করছি এবারও পারব।

এমন আয়োজনের উদ্দেশ্য কী?

`ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট`-এর সূত্রপাত হয়েছিল আমাদের মাছরাঙা টিভির রিয়েলিটি শো `ম্যাজিক বাউলিয়ানা` থেকে। একটি ভাবনা থেকেই তো নতুন ভাবনার জন্ম হয়। এই আয়োজনটি যখন শুরু করেছিলাম, তখন থেকেই আমাদের চিন্তা ছিল ছোট কোনো আয়োজন নয়, বড় পরিসরে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। যাতে আমাদের দেশের দর্শক-শ্রোতা নিজেদের গানের পাশাপাশি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোকগানের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। আমি মনে করি, লোকগান শুধু বাংলার মানুষের জীবনধারা নয় বরং, এ দেশের মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবনযাপনের সঙ্গে তা দারুণভাবে জড়িয়ে আছে। কারণ মানবজীবনের দুঃখ-বেদনা, আনন্দ-বিরহ, প্রেম-অভিমান-বন্দনা- সব মানবিক অনুভূতিকে গানের কথা ও সুরে প্রকাশ করে লোকসংগীত। সে কারণেই ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি-সারি আর বাউল গানের সুরে দেহ-মনে আসে পরম তৃপ্তি। পাশাপাশি আমাদের দেশের শিল্পীদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করার লক্ষ্যেই এ আয়োজন। আমি মনে করি, এই আয়োজনের দাবিদার পুরো বাংলাদেশ। আমরা যখন এই আয়োজনটি শুরু করেছিলাম, তখন থেকেই একই মূল মন্ত্রে আছি। প্রথম আয়োজনে আমাদের দেশের জনপ্রিয় লোকসংগীত শিল্পীদের নিয়ে শুরু করেছিলাম। এরপর আস্তে আস্তে আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সঙ্গে দেশবাসীর পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করেছি। এ ছাড়া গতবারের চেয়ে এবার বিদেশি শিল্পীদের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা আনা হয়েছে।

ছোটবেলায় সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণেই কি মাটির গানের প্রতি আগ্রহী হওয়ার...

অনেকটা তেমনই। আমার জন্ম পাবনা জেলায়। পাবনার পার্শ্ববর্তী জেলা কুষ্টিয়া। মাঝে পদ্মা নদী। প্রায়ই নদী পেরিয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে শুনতাম কিংবদন্তি বাউল লালন সাঁইয়ের গান। সেই থেকে হৃদয়ে গেঁথে আছে বাউল গানের কথা ও সুর। লালনের গানের বাণী যতটা ভাবিয়ে তুলত, ততটাই মুগ্ধ হতাম ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়া শুনে। আব্বাসউদ্দীন, আবদুল আলীমের পরিবেশনা আজও স্মৃতিতে অম্লান। আমি মনে করি, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের প্রতিটি দেশের লোকসংগীত হলো নিজ সংস্কৃতির মূল স্তম্ভ, যা ছড়িয়ে থাকে শিকড়ের গভীরে। আমাদেরও আছে লোকগানের বিশাল ভাণ্ডার, যা সমৃদ্ধ করেছে আমাদের সংস্কৃতিকে। হাজার বছর ধরে বাংলার শিকড়ে ছড়িয়ে থাকা গানগুলো আজও সমান্তরালভাবে আলোড়িত করে যাচ্ছে শ্রোতাদের প্রাণ। আমাদের এই আয়োজনের মাধ্যমে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে লোকগানের মুগ্ধতার ছোঁয়া। লোকগানের মানবতাবাদ এবং সহজ জীবন দর্শনের কারণে দেশজ লোকসংগীত নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছে নানা দেশের শ্রোতারা। গবেষণা হচ্ছে লোকগান ও এর শিল্পীদের নিয়ে।

এর আগে বলেছিলেন, এমন আয়োজন আপনি আপনার নিজের জেলা পাবনায় করতে চান ...

এখনও করতে চাই। কিন্তু পাবনায় এমন একটি আয়োজন করতে গেলে যে লজিস্টিক সাপোর্ট প্রয়োজন, তা এখনও আমাদের কাছে নেই। পাবনায় পর্যাপ্ত সংখ্যক ভালো হোটেল নেই, যেখানে আমি বিদেশি শিল্পীদের রাখতে পারব। এখন উন্নয়ন হচ্ছে। এখন পাবনায় সব মিলিয়ে ১০০ মানুষের জন্য ব্যবস্থা করা সম্ভব। যখন আমি এমন একটি আয়োজন করতে যাব, তখন কিন্তু আমাদের ইমেজেরও ব্যাপার জড়িয়ে পড়ে সেখানে। কারণ আমরা চাই আমাদের দেশে যেসব শিল্পী গান পরিবেশন করতে আসেন, তারা যেন আমাদের সম্পর্কে পজিটিভ ধারণা নিয়ে যান।

অনেকেই বলেন, অনুষ্ঠানটি কি সারারাত করা যেত না?

দর্শক-শ্রোতারা তো সবসময়ই চান সারারাত গান চলুক। কিন্তু আমাদের তো দর্শকের নিরাপত্তার কথাটাও চিন্তা করতে হবে। আমরা সবার কথা চিন্তা করে সবকিছু সাজিয়ে গুছিয়ে করছি। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই চেষ্টা করব, যাতে সব শিল্পীর গান দর্শক-শ্রোতারা আনন্দ নিয়ে শুনতে পারেন।

আপনি দেশের সংস্কৃতির উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকেন। আগামীতে আপনার পরিকল্পনা কী?

দেখুন, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই কিন্তু আমি চিন্তা করি না যে, সংস্কৃতির জন্য কী করব, কী করব না। এই চিন্তাভাবনা আপনা আপনি আসে। একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সেটি ধরে এগিয়ে যাই। আমরা আমাদের সান ফাউন্ডেশন থেকে এরই মধ্যে দুস্থ শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। এ ছাড়া শিল্পীদের রয়ালিটি নিয়ে কাজ করছি।

প্রথম দিন
 
-`ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৯`-এর উদ্বোধনী নৃত্যে থাকছে বাংলাদেশের শামীমা হোসাইন প্রেমার নৃত্যদল `ভাবনা`র পরিবেশনা। উৎসবে দলটি ধামইলসহ লোক ঘরানার নৃত্য পরিবেশন করবে।
 
-জর্জিয়ান ফোক ব্যান্ড শেভেনেবুরেবি। জর্জিয়ান লোকসংগীতকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ২০০১ সালে কয়েকজন সংগীতপ্রেমী ব্যান্ডটি গঠন করেন। ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পারফর্ম করা এ ব্যান্ডের এটাই প্রথম ঢাকা সফর।
 
-দেশের আলোচিত কণ্ঠশিল্পী শাহ আলম সরকারের পরিবেশনায় থাকছে আজ উৎসবের প্রথম দিন। বাউল সংগীতকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে কয়েক দশক ধরে গান করে যাচ্ছেন শাহ আলম সরকার। এ পর্যন্ত সাড়ে ছয়শ` লোকগানের অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে তার।
 
-`দ্য কিং অব ভাঙরা`খ্যাত ভারতীয় কণ্ঠশিল্পী দালের মেহেন্দি। এই প্রথম `ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৯`-এ অংশ নিচ্ছেন তিনি। নব্বইয়ের দশকে ভারতে ভাঙরা গানের অভিনব পরিবেশনা দিয়ে পেয়েছেন সুখ্যাতি। অ্যালবামের পাশাপাশি প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে জনপ্রিয় তিনি।

দ্বিতীয় দিন

- ২০১৬ সালে রিয়েলিটি শো `বাউলিয়ানা` থেকে উঠে আসা দুই কণ্ঠশিল্পী কামরুজ্জামান রাব্বি ও শফিকুল ইসলাম গাইবেন এবারের `ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট`-এ। লোকগান গেয়ে অল্প সময়ে দর্শকের মনোযোগ কেড়েছেন এ দুই শিল্পী।

- শৈশব থেকে বাউল গানের সঙ্গে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছেন কাজল দেওয়ান। এ পর্যন্ত তিন শতাধিক লোকসংগীতের অ্যালবাম প্রকাশ পেয়েছে এ শিল্পীর।
 
-পাকিস্তানের সুফি ঘরানার নন্দিত কণ্ঠশিল্পী হিনা নাসরুল্লাহ। উর্দু, সিন্ধি ও সারাইকি ভাষার সুফি গান গেয়ে এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংগীতপ্রেমীদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। ঢাকায় এবারই প্রথম পারফর্ম করতে যাচ্ছেন তিনি।
 
-বাউল ও সুফি গানের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ফকির শাহাবুদ্দিন। একই সঙ্গে তিনি গীতিকার, সুরকার ও সংগীত-গবেষক। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাউল গান গেয়ে অগণিত দর্শক-শ্রোতার মনোযোগ কেড়েছেন তিনি।
 
-মালির লোকসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী বলা হয় হাবিব কইটেকে। এই প্রথম ঢাকার মঞ্চে পারফর্ম করতে যাচ্ছেন তিনি। হাবিব কইটেকের সঙ্গে থাকছেন তার ব্যান্ড বামাদা ব্যান্ডের সদস্যরা।

তৃতীয় দিন
 
-কাওয়ালি গানের সাড়া জাগানো কণ্ঠশিল্পী মালেক দেওয়ানের পরিবেশনা দিয়ে শুরু হবে `ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৯`-এর শেষ রজনী। টুনু কাওয়ালের এ শিষ্য উৎসবে কাওয়ালির পাশাপাশি পরিবেশন করবেন মাইজভাণ্ডারি গান।
 
-রাশিয়ার করেলিয়া অঞ্চলের আলোচিত ব্যান্ড সাত্তুমা। নিও ফোক ঘরানার এ ব্যান্ডটি রাশিয়া ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ফিনল্যান্ড, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে সংগীত পরিবেশন করে দর্শক-প্রশংসা কুড়িয়েছে। এবারই প্রথম ঢাকার মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করতে যাচ্ছে দলটি।
 
-চন্দনা মজুমদার দেশের লোকগানের নন্দিত এক কণ্ঠশিল্পী। মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশন ছাড়াও চলচ্চিত্রে নিয়মিত গান করেন তিনি। লালন শাহ, হাছন রাজা, রাধারমণ, শাহ আবদুল করিমসহ বিভিন্ন গীতিকবির গান গেয়ে হৃদয় কেড়েছেন অগণিত সংগীতপ্রেমীর।
 
-সুফির সঙ্গে রক ফিউশনের পরিবেশনা দিয়ে বিভিন্ন দেশের সংগীতপ্রেমীদের মনোযোগ কেড়েছে পাকিস্তানি ব্যান্ড জুনুন। বাংলাদেশেও একাধিকবার সফর করেছে দলটি। এবার ভিন্ন আঙ্গিকের পরিবেশনা তুলে ধরতে `ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট`-এ অংশ নিচ্ছে জুনুন।