দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি ও শিল্পায়নের প্রতিবন্ধকতা

মোহাম্মদ মোসলেম আহমেদ

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ১২:৩৪ পিএম, ৬ এপ্রিল ২০১৯ শনিবার

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এ নিয়ে বিশ্বব্যাংক একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। যে তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে। বাংলাদেশের আগে রেয়েছে ইথিওপিয়া, রুয়ান্ডা, ভারত ও ভুটান। পঞ্চম অবস্থানে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও রয়েছে জিবুতি, আইভরি কোস্ট ও ঘানা।

 

অর্থনীতির এই দ্রুত বর্ধনশীল গতি ধরে রাখা এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার শিল্পায়নকে। আর এজন্য দরকার বিনিয়োগ।অর্থনৈতিক অবস্থার উর্দ্ধসূচক ধরে রাখতে হলে আমাদের বিদেশি বিনিয়োগ যেমন আনতে হবে, তেমনি স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে হয়ে।

সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহী করতে নানারকম পদক্ষেপ নিচ্ছে। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, কোন দেশে যদি স্থানীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী না হয় সে দেশে বিদেশি বিনিয়োগকারিরা সাধারণত বিনিয়োগে এগিয়ে আসে না। আমাদের এখানে স্থানীয় বিনিয়োগকারিরা ক্রমশই বিনিয়োগের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এর কারণ হচ্ছে, এখানে বিনিয়োগ করতে গেলে এমন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় যা মোকাবেলা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

ব্যাংক ঋণ বিনিয়োগ তথা শিল্পায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ তা হওয়ার কথা ছিল না। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই অবস্থান পরিবর্তনের কথা গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন। বলেছেন ব্যাংকের সুদের হার কমানোর প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করতে হবে। এটা তো বাস্তব যে, বাংলাদেশের শিল্পকে বহুমুখী করা সময়ের দাবি। কিন্তু সে দাবির প্রতি কারও যেন ভ্রুক্ষেপ নেই। শিল্পোদ্যোক্তাদের নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী চিন্তা নিয়ে যেখানে দেশে ও বিদেশে বাজার সৃষ্টি করা সঙ্গত, সেখানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা কোন যুক্তিযুক্ত পন্থা হতে পারে না। দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের নতুনভাবে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে শিল্পায়ন ঘটানো যায় সে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। সেখানে পুরনো ধারা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তারা অবশ্য বলে থাকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক। সে জন্যযথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প কিছু নেই। কিন্তু এটাও তো সত্য, ঋণ নিয়ে যদি ঋণের অর্থ যথা সময়ে ফেরত দেয়া এবং সুদ পরিশোধ করা হয়, তবে বাধা সঙ্কুচিত হতে যেমন বাধ্য, তেমনি ব্যাংকগুলোর সচল অবস্থান নড়বড়ে হতে পারে না। আর তখন ব্যাংকগুলোও সুদের হার কমিয়ে আনতে পারে। কিন্তু এদেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণ শোধ না করা। এই প্রবণতা কোন ক্ষেত্রকেই বিকশিত করার সহায়ক নয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঋণের উচ্চ সুদের হার নিয়ে অতীতে ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে বৈঠক এবং আলোচনা করেছেন। আগে সরকারী প্রতিষ্ঠানের সত্তর ভাগ অর্থ সরকারী ব্যাংকে আর ত্রিশভাগ অর্থ বেসরকারী ব্যাংকে রাখা হতো। ব্যাংক মালিকরা দাবি তোলেন যে, এই হার যদি সমান সমান অর্থাৎ ৫০ ভাগ করা হয় তাহলে সুদের হার একক ‘ডিজিটে’ নামিয়ে আনা হবে। সরকার তাতে সম্মতিও প্রদান করে।

সুদের হার নয় শতাংশে নামিয়ে আনলেও সকল ব্যাংক তা করেনি। বরং বাড়াতে বাড়াতে তা ১৪, ১৫ ও ১৬তে নিয়ে গেছে। কেন তারা করেনি সে বিষয়ে কোন ব্যাখ্যাও প্রদান করেনি। অথচ এই ব্যাংক মালিকদের শিল্প-কলকারখানা রয়েছে। তারাও ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। সেই তারাই সিদ্ধান্ত মেনে ঋণের হার একক ডিজিটে আনার পক্ষপাতী কেন নয়, তা আসলেই বোধগম্য নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর বেসরকারী খাতকে সবচেয়ে বেশি উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। দেশে সত্তর লাখের মতো শিল্প-কারখানা বেসরকারী খাতে রয়েছে। প্রতিবছর সেখানে একজন লোকও কাজের সুযোগ পেলে সত্তর লাখ লোক কাজ পেতে পারে। বাস্তবে তার কিছুই দেখা যায় না। বর্তমান সরকার সবচেয়ে বেশি ব্যাংক-বীমা করার সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যকে গতিশীল করার জন্য। মানুষের মধ্যে ব্যাংকের ব্যবহারের প্রবণতাও সরকারই তৈরি করে দিয়েছে।

এটা তো সর্বজনবিদিত যে, বর্তমান সরকার ব্যবসায়ীবান্ধব। ব্যবসায়ীরা যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে ও ব্যবসা-বাণিজ্য ভালভাবে করতে পারে এবং দ্রুত শিল্পায়ন হয় সে লক্ষ্যে নানাবিধ পদক্ষেপ নিয়েছে গত দশ বছরে। দেশে এমন বহু পণ্য রয়েছে যা উৎপাদন ও বাজারজাত করে শিল্পায়ন এবং কৃষিকে রক্ষার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটানো যায়। দেশে যুগোপযোগী শিল্পনীতি রয়েছে। সেই নীতি অনুযায়ী শিল্পায়নের জন্য আরও বেশি প্রচেষ্টা এবং শ্রমঘন শিল্প গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিদ্যমান ‘জটিলতা’ অবিলম্বে দূর করে দেশকে শিল্প-বাণিজ্যে আরও এগিয়ে নিতে হবে। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে সব প্রতিবন্ধক দূর করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট/অর্থনীতি বিশ্লেষক