যৌন সহিংসতা

নারী কোথায় নিরাপদ?

আনিসুল হক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ১২:০৫ পিএম, ১০ মে ২০১৯ শুক্রবার

প্রথমে একটা প্রশ্ন করি। আপনি একজন নারী, যেকোনো বয়সের—আপনি শিশু হতে পারেন, বালিকা হতে পারেন, তরুণী হতে পারেন, বয়স্ক হতে পারেন। আপনি রাস্তায় একটা বাসে উঠলেন। উঠে দেখলেন বাসে কন্ডাক্টর আছে, হেলপার আছে, আর আছে ড্রাইভার। আর কেউ নেই! আপনি কী করবেন? আপনি কি নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারবেন? প্রথম সুযোগেই কি আপনি বাস থেকে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না?

আমার নিশ্চিত ধারণা, আপনি ভয় পাবেন, বিপন্ন বোধ করবেন, চেষ্টা করবেন দ্রুত নেমে যেতে!

এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন: আপনি একজন পুরুষ। রাতের বেলা আপনি একটা বাসে উঠেছেন, ধরা যাক, আশুলিয়ার রিং রোডে। বাসে উঠে দেখলেন আপনি একা। আর বাসে আছে ড্রাইভার, কন্ডাক্টর, হেলপার। আপনি কি ওই বাসে নিজেকে নিরাপদ বোধ করবেন?

এরও উত্তর হলো: না।

তাহলে বড় পরিসরে যাওয়ার আগে আমাদের স্পষ্ট প্রস্তাব, আমাদের পরিবহন, আমাদের গণপরিবহন নিরাপদ নয়, এর সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষগুলোকে আমরা নিরাপদ মনে করি না। কাজেই আমাদের বাস-ট্রাক-গাড়ির ড্রাইভার, হেলপার, কন্ডাক্টরদের একটা নেটওয়ার্কের মধ্যে আনুন। কে কোথায় কখন কোন ডিউটিতে আছেন, সেটা যেন আমাদের জানা থাকে। তাঁদের প্রশিক্ষণ দিন। আমরা জানি, আমাদের প্রায় ২৬ লাখ গাড়ি আছে, কিন্তু লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক এর অর্ধেক। আর যাঁরা লাইসেন্স পেয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগেরই প্রশিক্ষণ নেই। লাইসেন্স পাওয়ার পরীক্ষা নিলে তাঁরা ফেল করবেন। আর তাঁদের যে প্রশিক্ষণ হবে, তা কেবল গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নয়; প্রশিক্ষণ হবে মূল্যবোধের। তাঁদের উপলব্ধি করতে পারতে হবে যে প্রতিটা মানুষের জীবন মূল্যবান। সামান্য ভুলেই এক বা একাধিক মানুষের জীবনহানি ঘটতে পারে। বোঝাতে হবে, নারী এবং পুরুষ সমান; এবং নারীকে বিশেষভাবে সম্মান করতে হয়। এটা ঘরে, এটা বাইরে। সম্মান করতে হয় নিজের স্ত্রীকে, মাকে, বোনকে, ভাবিকে, বান্ধবীকে, প্রেমিকাকে, সন্তানকে, দাদি-নানি-খালাকে, ছাত্রীকে, শিক্ষিকাকে, পরিচিতাকে, অপরিচিতাকে।

এই শেষের শিক্ষাটা কেবল চালক, সহকারী, কন্ডাক্টরদের লাগবে তা নয়; আমাদের সবার লাগবে। সব পুরুষের লাগবে, সব নারীর লাগবে।

সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে এক নার্সকে চলন্ত বাসে ধর্ষণ এবং আঘাত করে মেরে নিচে ফেলে দেওয়ার ঘটনার সূত্র ধরে এই লেখার অবতারণা। পত্রিকান্তরের খবর, ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলে বাসে নিহত রূপা হত্যার বিচারকাজ এক বছর ধরে ঝুলে আছে। এ-রকম অজস্র খবর প্রতিদিন আমাদের পড়তে হচ্ছে। ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি যেন মহামারির আকার ধারণ করেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেওয়া পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে গত ১৯ জানুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৫৮৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৭৮ জনকে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ধর্ষণের শিকার নারীদের মধ্যে ৮৬ শতাংশই শিশু ও কিশোরী। ৬ বছর থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম ১৮ দিনে ২৩টি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ জনই শিশু ও কিশোরী। ধর্ষণের পর হত্যার শিকারও হয় এরাই বেশি। অনেক ধর্ষণের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না।

ভারতে নির্ভয়া ধর্ষণ নিয়ে গণজাগরণ ও প্রতিরোধের পর নানা ধরনের গবেষণা হয়েছে, কেন ওখানে এত ধর্ষণ হয়! গবেষকেরা বলেছেন, পুরুষাধিপত্যবাদ এর একটা প্রধান কারণ। দ্বিতীয় কারণ বলা হয়েছে, প্রতিকার, প্রতিরোধ এবং প্রতিবিধানের ব্যবস্থা না থাকা।

কোনোই সন্দেহ নেই, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানির একটা প্রধান কারণ পুরুষতন্ত্র। পুরুষের আছে জোর। পুরুষ জোর খাটাতে পারে, এই মনোভাব। এটা আছে সমাজে, পরিবারে, আচারে, সংস্কৃতিতে, মূল্যবোধে, পুস্তকে, বাগধারায়, কিংবদন্তিতে, বিশ্বাসে। এর বিপরীতে সমমর্যাদা, প্রতিটা মানুষকে সম্মান করতে শেখা, মর্যাদা দেওয়া—এই ধারণা সমাজে অনুপস্থিত। আমরা ছোটবেলা থেকে যে বালকসমাজে বড় হয়েছি, নারীর প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করাকে সেখানে স্বাভাবিক কাজ বলেই গণ্য হতে দেখেছি। কেউ কোনো সাহসিকতার কাজে যুক্ত না হলেই তাকে আমরা বালিকাসুলভ বলে হেয় করতাম। নারী যে অধস্তন, এটা আমাদের বালকসমাজে একটা স্বাভাবিক ধারণা হিসেবে কায়েম ছিল। এখনো আছে। সেখান থেকেই বহু সর্বনাশা আচরণের সূত্রপাত।

দ্বিতীয় হচ্ছে বিচার না হওয়া। এই ধরনের অপকর্ম করে পার পাওয়া যায়, এই ধারণা সমাজে আছে। এবং এই উদাহরণও সমাজে আছে। তনু হত্যাকাণ্ডের বিচার হলো না, কত প্রতিবাদ বিক্ষোভ হলো, তবু। প্রতিবাদ বিক্ষোভ করে নব্বইয়ের দশকে দিনাজপুরের ইয়াসমিন হত্যা ও ধর্ষণের বিচার অবশ্য নারী অধিকারকর্মীরা আদায় করে নিতে পেরেছিলেন। আমাদের আবারও জাগতে হবে, আবারও বিচার এবং শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

নারী, শিশু, বালক—কেউই নিরাপদ নয়। ঘরে-বাইরে, মাঠে-ঘাটে, অফিস-আদালতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে, নৌকায়, হাটে-বাজারে, ধর্মালয়ে কোথা থেকে এই সব অপরাধের খবর আসছে না? কোনো জায়গা বাকি নেই। কোনো বয়স বাকি নেই। এবং ভয়াবহ হলো, ধর্ষণের পর খুনও করা হচ্ছে। মাদ্রাসার শিক্ষকের যৌনাপরাধ ঢাকতে মাদ্রাসাছাত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনা একটা উদাহরণ মাত্র। শিকারের মধ্যে শিশু আছে, নারী আছেন, বালক আছে। শিকারি কিন্তু পুরুষই। পুরুষতন্ত্রই যে প্রধানত দায়ী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই পুরুষতন্ত্রকে ভেঙেচুরে বিদায় করার কাজটা আমাদের করতে হবে নিজের ঘর থেকে। নিজের শিশুটাকে দিতে হবে মূল্যবোধ। আমার ঘরের শিশুই একদিন ঘরে কিংবা রাস্তায় বের হবে, খেলার ছলেও যেন সে একজন নারীকে, একজন শিশুকে, একজন মানুষকে অপমানিত না করে।

বলছিলাম আজকের লেখাটায় বড় পরিসরে না করে নির্দিষ্ট একটা প্রশ্নে আলোকপাত করব। গণপরিবহনে নারী-পুরুষনির্বিশেষে যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নজরদারি হতে পারে একটা কার্যকর অস্ত্র। আমাদের সবগুলো গাড়ির ডিজিটাল নম্বরপ্লেট বাধ্যতামূলক চাই। পথে পথে ক্যামেরা চাই, কখন কোন গাড়ি কোন পথে যাচ্ছে, তার রেকর্ড থাকা চাই। গণপরিবহনে সিসিটিভি চাই। গণপরিবহনের শ্রমিক-কর্মচারী-স্টাফদের প্রশিক্ষণ চাই। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা চাই।

কিন্তু সমস্যা তো কেবল গণপরিবহনে নয়। কোনো লাইব্রেরিতে রাতের বেলা একটা মেয়ে আর পাঁচটা ছেলে যদি পড়ে, মেয়েটা কি ভাবতে পারবে সে নিরাপদ? কোনো সিনেমা হলে একজন নারী যদি ঢুকে দেখেন আর কেউ নেই, তিনিই একমাত্র দর্শক, তিনি কি নিজেকে ভাবতে পারবেন নিরাপদ? একটা থানায় কয়েকজন পুরুষ পুলিশের কাছে একজন নারী যদি একা যান, তিনি কি নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারবেন?

এই সমাজের কোথাও গভীর কোনো অসুখ রয়েছে। আর সেই রোগটার নাম পিতৃতন্ত্র, পুরুষতন্ত্র। এটার অংশ নারীরাও হতে পারেন। যে নারীরা মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতের গায়ে আগুন লাগাতে গিয়েছিল, তারাও ওই পুরুষতন্ত্রেরই অংশ। একই সঙ্গে শিকার এবং শিকারি।

পরিবারে, স্কুলে, শিক্ষায়, গণমাধ্যমে, নাটকে, গানে, সিনেমায় নারীকে হেয়জ্ঞান করার শিক্ষা বন্ধ করতে হবে। নারীর সমানাধিকার, সমমর্যাদা, সমান অংশগ্রহণ নারীকে অধস্তন ভাবা, নির্যাতনযোগ্য ভাবা বন্ধ করতে হবে। আর দরকার বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে কার্যকর করা। বিচার চাইতে গেলেও তো আমাদের ব্যবস্থা শিকার নারীটিকেই সবচেয়ে বেশি অপদস্থ করে, পদে পদে বাধা দেয়। কুররাতুল-আইন-তাহ্‌মিনা আর আসাদুজ্জামানের প্রথম আলোয় প্রকাশিত এপ্রিল ২০১৮-এর সিরিজ রিপোর্টে আমরা তা দেখেছি।

নারী-শিশুর অবমাননা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে একটা সামাজিক আন্দোলন, সামাজিক প্রতিরোধের জোয়ার সৃষ্টি করা দরকার। হাসপাতালের একজন সিনিয়র নার্স ঢাকা থেকে প্রথম রোজার দিনটা বাবা-মায়ের সঙ্গে বাড়িতে কাটাবেন বলে বাসে উঠেছিলেন। গণধর্ষণের পর হত্যার শিকার হলেন তিনি। আর কবে আমরা জেগে উঠব, প্রতিবাদ করব, প্রতিরোধ করব?

আনিসুল হক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক