পরিবেশ দূষণরোধে রাজশাহীর পরিচিতি বিশ্বজুড়ে

রফিকুল ইসলাম

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৩:২৬ পিএম, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ শুক্রবার

পরিবেশ উন্নয়নে খ্যাতি অর্জন করেছে রাজশাহী। উত্তরের এই বিভাগীয় নগরী এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে গোটা বিশ্বের কাছে পরিচিত একটি নাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০টি উদ্যোগের মধ্যে একটি উদ্যোগ পরিবেশ সুরক্ষা। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী ২০০৮ সালে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন প্রথমবারের মত মেয়র নির্বাচিত হয়ে রাজশাহী মহানগরীর পরিবেশ উন্নয়নে উদ্যোগ নেন। তাঁর বহুমুখি কাজের ধারায় বায়ুদূষণরোধে সফলতা অর্জনে বিশ্ব সেরার খেতাব পায় রাজশাহী। সেই ধারা অব্যাহত রাখতে নগরীর পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে নেয়া হয়েছে নানামুখি উদ্যোগ।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পরিবেশ কর্মকর্তা সৈয়দ মাহমুদুল ইসলাম জানান, শহরের প্রতিটি আইল্যান্ড সুন্দর করার লক্ষ্যে মেয়রের নির্দেশে বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় গত মার্চের ২৫ তারিখে সাউথ এশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান ইকলি’র সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। এছাড়া গত ৮ ফেব্রুয়ারি পরিবেশ সুরক্ষায় ও নাগরিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে প্রিজম বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী প্রিজম বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণ ও পরিশোধন করবে। রাজশাহী নগরীতে যেসব জলাশয় বা পুকুর রয়েছে সেগুলোকে সংরক্ষণ ও উন্নয়নের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব পুকুর বা জলাশয় সংরক্ষণের ফলে পানির অ্যাকুইফার লেবেল বা ওয়াটার টেবল ঠিক থাকে। যার ফলে আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জ হয়। এর সুফল হিসেবে টিউবওয়েলগুলোতে সব মৌসুমেই পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাবে। তিনি জানান, বাতাসে বালুকণার পরিমাণ কমানোর জন্য পদ্মা নদীর চরে বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। এর ফলে এখন বায়ু দূষণ কম হচ্ছে।
শুধু বায়ু দূষণরোধেই নয়, নগরীর বর্জ্য নিষ্কাশনেও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন। নগরীর সব বর্জ্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংগ্রহ করে সেগুলো নগরীর বর্জ্য সংগ্রহাগার বা ডাম্পিং সেন্টারে জমা করা হয়। তারপর সেগুলো ট্রাকে করে নগরীর উপকণ্ঠ সিটি হার্ট সংলগ্ন এলাকায় নিয়ে গিয়ে নিয়মমাফিক ড্রাম্পিং করা হয়।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র-১ মো. শরিফুল ইসলাম বাবু বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমরা কেন্দ্রীয় এবং সিটি করপোরেশন দুইভাবে কাজ করি। আমাদের ৩০টি ওয়ার্ডের ২৮টি পয়েন্টে প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মহানগরের সমস্ত বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। রাত ১০টার পর বর্জ্যগুলো নির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তর করা হয়। রুটিন কাজের অংশ হিসেবে প্রতিদিন রাতে গোটা মহানগরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। শহর পরিষ্কার এবং পরিচ্ছন্ন কাজে বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের ১ হাজার ৪০০ কর্মী কাজ করে।

রাজশাহীর সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, মহানগরীকে সবুজায়ন করার জন্য ও বিশেষ বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমরা জিরো সয়েল প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি। এই প্রজেক্টের মাধ্যমে শহরের কোথাও ফাঁকা জমি থাকবে না। যেখানেই ফাঁকা জমি দেখা যাবে সেখানেই বৃক্ষ রোপণ করা হবে। পাশাপাশি নগরীর প্রতিটি বাড়ির মালিকদের ছাদ-বাগান করায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। রাজশাহী শহরকে এশিয়ার এক নম্বর শহর হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

শুধু বায়ু দূষণ রোধই নয়, দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে মরুকরণ রোধেও কার্যকরি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে পদ্মা নদী খনন এবং ভাঙনরোধে পাঁচ কিলোমিটার পদ্মা নদীর তীর সংরক্ষণ করার পদক্ষেপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পানি সমস্যা দূরীকরণে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। পানির সমস্যা দূরীকরণে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে কাজে লাগানো হচ্ছে। পুকুর ও খাল খনন করে পানি সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গভীর নলকূপ শাখার প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুল লতিফ জানান, ক্রসড্যামের মাধ্যমে বরেন্দ্র অঞ্চলের বৃষ্টির পানি আটকে রাখা হয়- পাশাপাশি সোলার পাতকুয়ার মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হয়। পরিবেশ সুরক্ষায় যা বিশেষ ভূমিকা রাখে এবং গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচ হয়।

খালগুলো আরো গভীর ও প্রশস্ত করে খনন করা হয়েছে যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫শ কিলোমিটার। পন্টুন পদ্ধতিতে পদ্মা নদী থেকে পানি সরমংলা খালে ফেলা হয়। পরে খাল থেকে জমিতে সেচ দেয়া হয়। পদ্মা ও মহানন্দা নদী থেকে ডাবল লিফটিং পদ্ধতিতে সেচ দেয়া হচ্ছে। ১০৬টি সোলার পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির চাহিদা পূরণে যা বিশেষ ভূমিকা রাখছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রায় তিন হাজার পুকুর ও দিঘি খনন করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩০ লক্ষ তালগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় প্রায় ২ কোটি বিভিন্ন প্রজাতির চারা রোপণ করা হয়েছে।

এছাড়া কৃষি জমির সম্প্রসারণের লক্ষ্যেও কাজ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। যেহেতু আবহাওয়া ও জলবায়ু ফসলের অনুকূলে থাকায় প্রতিবছর ব্যাপক ফসলের উৎপাদন হচ্ছে। রাজশাহীতে আম, লিচু, ধান ও আখসহ সব ফসলই ব্যাপক পরিমাণে উৎপন্ন হয়।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামসুল হক বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় কৃষকদের প্রতিটি ট্রেনিং, সেমিনার এবং কর্মশালায় জৈব সার ও জৈব কিটনাশক ব্যবহারে বিশেষভাবে নির্দেশ প্রদান করা হয়। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে কৃষি ট্রেনিংগুলোতে সঠিক মাত্রায় সার ও কিটনাশক ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয়। আগামিতে পরিবেশবান্ধব কীটনাশক বাজারে নিয়ে আসার জন্য সরকার কীটনাশক উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোকে বিশেষ সহায়তা প্রদান করছে বলেও তিনি জানান ।

পরিবেশের ভারসাম্য সুরক্ষায় জেলার সব উপজেলায় পুকুর খনন বন্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। যাতে কৃষি জমি নষ্ট না হয় এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে না যায়। তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে পুকুর খনন করে চলেছে যা পরিবেশের জন্য বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন পরিবেশবাদীরা।

রাজশাহী জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রুহুল আমীন জানান, কৃষি জমি কেটে যাতে কেউ পুকুর খনন করতে না পারে এইজন্য জেলার সব উপজেলায় পুকুর খননের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কারণ পুকুর খনন করলে ভূ-গর্ভস্থ’ পানির স্তর নিচে নেমে যায়, কৃষি জমি নষ্ট হয়। এর ফলে পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। পরিবেশের সুরক্ষার কথা ভেবেই পুকুর খননে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যাতে কেউ পুকুর খনন করতে না পারে এইজন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এছাড়া পরিবেশ সুরক্ষায় বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে মাসিক সম্মেলনে পরিবেশবান্ধব একটি এজেন্ডা বাস্তবায়িত হয়েছে। যার মাধ্যমে জেলা প্রশাসক কর্তৃক সব উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের অবৈধ ইটভাটা দ্রুত অপসারণ এবং প্রতিমাসে অপসারণের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদফতর রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০১৮ সালের জুলাই থেকে শুরু করে মে ২০১৯ পর্যন্ত অবৈধ ইটভাটায় মোট ৬২টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। প্রতিটি অভিযানে একাধিক অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দেয়া এবং মালিকদের বিভিন্ন পরিমাণে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদফতর রাজশাহী জেলার উপ-পরিচালক মামুনুর রশিদ বলেন, ইটভাটা অপসারণ অভিযান পরিচালনা ও অর্থদণ্ডের ফলে ভাটাগুলো এখন পরিবেশবান্ধব হচ্ছে। যেমন নাটোরে এখন মাত্র একটি ছাড়া সবগুলো ভাটাই পরিবেশবান্ধব। নাটোরের সিংড়া উপজেলার ১৪টা ইটভাটা। এগুলো প্রতিটিই এখন শতভাগ পরিবেশবান্ধব। সেখানে পরিবেশের ক্ষতি করে এমন একটিও অবৈধ ইটভাটা নেই। এক কথায় ইটভাটাগুলো ইট প্রস্তত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩; ১ জুলাই ২০১৪ থেকে কার্যকর আইনগুলো মেনেই তৈরি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, পরিবেশ অধিদফতর রাজশাহী জেলা প্রতি মাসে ইটভাটা মালিকদের নিয়ে অ্যাডভোকেসি সভা করার ফলে এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে। আমরা চাই ইটভাটাগুলো ১০০ শতাংশ পরিবেশবান্ধব করতে। তিনি আরো বলেন, পরিবেশ দূষণ রোধে আমরা গত জুলাই থেকে মে ২০১৯ পর্যন্ত ১১টা পলিথিন বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ পলিথিন জব্দসহ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।

মাটি দূষণরোধে কাজ করছে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়নের সিনিয়র সায়েন্টিফিক কর্মকর্তা খন্দকার ড. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সুষমভাবে সার ব্যবহার করা হলে পরিবেশ দূষণ রোধ হয়। আমরা প্রতিটি উপজেলার মাটির নমুনা সংগ্রহ করে মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে মাটির সঠিক গুনগতমানের ভিত্তিতে কৃষকদের সার প্রয়োগে উদ্বুদ্ধ করি। এজন্য প্রতিটি উপজেলায় কৃষকদের হাতে-নাতে ট্রেনিং দেয়া হয়। এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও কৃষকদের ট্রেনিং প্রদান করা হয়। তিনি আরো বলেন, মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে সার প্রয়োগ হলে জমির উর্বরতা দীর্ঘদিন ভালো থাকে এবং পরিবেশের ভারসাম্যও ঠিক থাকে।

এছাড়া পানির দূষণরোধসহ পদ্মা নদী ড্রেজিং, নদীর তীর সংরক্ষণ ও প্রতিটি উপজেলায় খাল খননের কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী মহম্মদ আলী জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমাদের একটি রাবার ড্যামের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় আমরা জাতীয় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জেলার প্রতিটি উপজেলায় খাল খনন প্রক্রিয়া পরিচালনা করছি। এছাড়া মহানগরীর শ্রীরামপুর থেকে পবার সোনাইকান্দি পর্যন্ত পদ্মা নদীতে ছয় কিলোমিটার ড্রেজিং কাজ শুরু হয়েছে। এটা চওড়া হবে এক কিলোমিটার। এরই মধ্যে পদ্মা নদীর দুই হাজার ২০০ মিটার এলাকায় খনন সম্পন্ন হয়েছে।

স/র