পরীক্ষায় অকৃতকার্যতা : মনস্তাত্ত্বিক না সামাজিক জটিলতা?

ডেস্ক নিউজ

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৭:৫২ পিএম, ২৯ জুলাই ২০১৯ সোমবার

 লক্ষণীয় যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার মূলত প্রথম বর্ষেই সবচেয়ে বেশি, কিন্তু কেন? একজন শিক্ষার্থীর এই অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে দায়ভার কি শুধু তারই? এজন্য কি তার মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা দায়ী নাকি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমরাও তার জন্য দায়ী সেটা নিয়েই আমার আজকের এই লেখা। সম্প্রতি গণিত বিভাগে অনেক ছাত্র-ছাত্রীর পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনার কিছু কারণ অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছি। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ফেল করার এবং ঝরে পড়ার জন্য সম্ভাব্য কারণগুলো হলো- ১. আবাসন সমস্যা, ২. একাডেমিক সমস্যা, ৩. ব্যক্তিগত অসুবিধা, ৪. আর্থিক সমস্যা, ৫. কোর্স পছন্দ না করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন ও ৬. অন্যান্য।

১. আবাসন সমস্যা: শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা তাদের ঝরে পড়া এবং ফেল করার পেছনে অন্যতম কারণ। যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে তাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যক শিক্ষার্থী তাদের পরিবারের সঙ্গে থাকার সুযোগ পায়। বাকি শিক্ষার্থীদের হয়তো মেসে, না হয় বেশিরভাগকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে উঠতে হয়। যারা হলে ওঠে তাদের অবশ্যই রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকতে হয়। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর জায়গা হয় গণরুমে নয়তো কোনো ভাবে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়। সেখানে না থাকে পড়ার পরিবেশ না থাকে সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ। একই সাথে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও বিভিন্ন সামাজিক সংস্থার সাথে যুক্ত থাকতে বাধ্য করা হয় এবং এতে তাদের পড়াশোনার প্রয়োজনীয় সময় নষ্ট হয়।

 বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান অর্জনের জায়গা, শিক্ষার্থীদের কাজ জ্ঞান অর্জন করা। তাদের উপর্যুক্ত সমস্যার জায়গায় গুলোতে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার কমে আসুক, তারুণ্যের হাসিতে হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠুক বিশ্ববিদ্যালয়-এই আশা করছি। 

একজন শিক্ষার্থী সারাদিন ক্লাস শেষ করে যখন তার পড়ার টেবিলে বসার কথা, তখন তাকে মিছিল, মিটিংয়ে যেতে হয়। এর মধ্যে তো তাকে প্রাইভেট টিউশনও করতে হয় নিজের হাত খরচ তোলার জন্য। এতে একজন শিক্ষার্থী মানসিক চাপে ভুগতে থাকে এবং সেটার প্রভাব অবশ্যই তার পড়াশোনার ওপর এসে পড়ে। স্বাভাবিকভাবে তার পরীক্ষার ফলাফলের ওপর এটার প্রভাব পড়ে। একজন শিক্ষার্থীকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন ব্যবস্থায় একটি বাসযোগ্য পরিবেশ দিতে পারছি না, সেটার জন্য শিক্ষার্থী শুধু দায়ী নয়, বরং তার কিছুটা দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরও এসে বর্তায় এবং সেটা আমরা কোনো ভাবেই অস্বীকার করতে পারি না।

২. একাডেমিক সমস্যা: শিক্ষার্থীরা তাদের স্কুল এবং কলেজ সময়ে জানতো কী করে অধ্যয়ন করতে হবে, কখন পড়াশোনা করা যায় এবং কীভাবে পড়তে হবে? এটা তারা জানার জন্য তাদের অভিভাবক, স্কুল এবং কলেজের শিক্ষক ও প্রাইভেট শিক্ষকের সহায়তা পেত কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রাখে তখন তাদের এ সিদ্ধান্তগুলো নিজেদেরই নিতে হয় এবং অনিবার্য ভাবে তারা এর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যর্থ হয়। অনেক সময় তারা নিয়মিত ক্লাস করছে কিন্তু ক্লাস লেকচারে কিছু যদি না বুঝতে পারে সেটা না পড়ে রেখে দিচ্ছে। সেটা নিয়ে কোর্স শিক্ষক এর কাছে যাচ্ছে না, এবং এই না পড়ার ও সমস্যাগুলো সমাধান না করার যে মানসিকতা তা তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।

এছাড়া শিক্ষার্থীরা প্রায় সময়ই পড়াশোনার বাইরে এক্সট্রা-ক্যারিকুলার কাজে খুব বেশি বা মাত্রাতিরিক্ত মনোযোগ দেয়, যা তাদের একাডেমিক জীবন এ পড়াশোনার প্রতি আকর্ষণ কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে গণিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য বিষয়গুলোর মতো না যেখানে অন্যান্য বিষয়ে অগভীর ও স্বল্প চর্চার মাধ্যমেই বিষয়টিকে জানা যায় এবং পাস করা যায়। বরং গণিতে গভীর অধ্যয়ন ও চর্চার দরকার হয়।

অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ‘অলস পড়া’ তাদের খারাপ ফলাফলকে ত্বরান্বিত করে। তাদের এ অলসতা তাদেরকে পড়তে অনুৎসাহিত করে, ক্লাসে তারা মনোযোগী হয় না অথবা ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত থাকে না, ক্লাস এসাইনমেন্ট বা এক্সারসাইজগুলো নিয়মিত করে না, এমনকি তারা গবেষণার বিষয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখায় না। একই সাথে অনেক শিক্ষার্থী `ওভার কনফিডেন্ট` থাকে পড়াশোনার ব্যাপারে। সে ভাবে সে সবই জানে, তাই পরীক্ষার পূর্বে সে ঠিকমতো প্রস্তুতি নেয় না, এটাও খারাপ ফলাফলের জন্য দায়ী।

 

৩. ব্যক্তিগত অসুবিধা: শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ তার ব্যক্তিগত অসুবিধা। এর মধ্যে বিশেষ কিছু কারণ আছে, যেমন পারিবারিক সমস্যা, শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনায় গ্রুপ স্টাডি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই বন্ধুদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করাটাও খুবই দরকার। কিন্তু কিছু শিক্ষার্থী খুব বেশি অন্তর্মুখী এবং সে কারণে সে তার বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না বা দীর্ঘ সময় নিয়ে নেয়, যা পরবর্তীতে তার জন্য কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

আবার কিছু শিক্ষার্থী এই গ্রুপ স্টাডির গুরুত্ব বুঝতে পারে না। এভাবে তারা পড়াশোনায় অন্যদের থেকে পিছিয়ে পরে । অন্য সমস্যাগুলোর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় কাজের প্রতি বেশি আগ্রহী, পিতা-মাতার কাছ থেকে অতিরিক্ত চাপ, একাডেমিক অযোগ্যতা নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগা, কারো সাথে সম্পর্কজনিত মানসিক চাপ এবং সহনশীলতার অভাব শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় ফেল করার পেছনে বড় অবদান রাখছে।

৪. আর্থিক সমস্যা: শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার পেছনে আর্থিক সমস্যাও একটা কারণ কিন্তু আমার মনে হয় না এটা এখানে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। বরং আর্থিক সমস্যা সমাধানে বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ।

৫. কোর্স পছন্দ না করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এর পরিবর্তন: প্রথম বর্ষের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার পেছনে বড় একটা কারণ তার কোর্স পছন্দ না হওয়া এবং পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারা। সে হয়তো এমন একটি বিষয় পড়তে চেয়েছিল যেটা সে পড়তে পছন্দ করে কিন্তু সে বিষয়ে সুযোগ না পেয়ে তাকে বাধ্য হয়ে অন্য একটি বিষয় পড়তে হচ্ছে।

সেই পছন্দের বিষয়ে পড়ার জন্য সে অনেক সময় একটি বছর ড্রপ করছে এবং পরের বছর নতুন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে। অনেক সময় এমনও হয়, একজন শিক্ষার্থী এক বা একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে এবং সে সবচেয়ে ভালোটাকেই বেছে নিয়েছে। কিন্তু শুধু সুবিধাজনক পরিবেশের অভাবের কারণেই সে আর সেই প্রতিষ্ঠানে না থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাচ্ছে।

৬. অন্যান্য: বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ করে আমাদের গণিত বিভাগে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রতিটা ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের এর সংখ্যা। ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের এর সংখ্যা অনেক বেশি হলে শিক্ষক এবং ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। বরং ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের এর সংখ্যা কম হলে একজন শিক্ষক প্রতিটা ছাত্র-ছাত্রীকে জানার সুযোগ পায় এবং তাদের সমস্যাগুলোও আলাদা আলাদা ভাবে তুলে ধরতে পারে। আমাদের এ সংখ্যাটা অনেক বেশি হওয়ার কারণে শিক্ষকরা যেমন সব ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্যাগুলো দেখার সুযোগ পায় না, একই ভাবে ছাত্র-ছাত্রীরাও নিজেদের সমস্যাগুলো সঠিক ভাবে তুলে ধরতে পারে না।

কিছু সমাধান
১. প্রথমেই ভেবে বিষয় নির্বাচন করা; ২. কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায় দিয়ে পড়াশোনা করা; ৩. নিয়মিত ক্লাস করা’ ৪. গ্রুপ স্টাডিকে গুরুত্ব দেয়া; ৫. নিজেকে নিজে উৎসাহ দেয়া এবং পরিবারের কাছ থেকে সেটা পাওয়া; ৬. যে কোনো সময় যে কোনো সাহায্যের জন্য শিক্ষক এবং বিভাগের শরণাপন্ন হওয়া; ৭. নিজের সমস্যাগুলো বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা; ৮. আর্থিক সমস্যা কাটিয়ে ওঠা; ৯. ছাত্র উপদেষ্টার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা; ১০. বিভিন্ন বৃত্তির খোঁজখবর রাখা এবং আবেদন করা; ১১. বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি থাকা; ১২.বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন এবং পরিবহন সুবিধা ব্যবহার করা; ১৩. বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে হলের পরিবেশের মান উন্নয়নে এবং মেধারভিত্তিতে হলগুলোতে সিট দেয়র জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; ১৪. শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হিসেবে শিক্ষকদের আরো বেশি আন্তরিক এবং দায়িত্বশীল হতে হবে।

সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান অর্জনের জায়গা, শিক্ষার্থীদের কাজ জ্ঞান অর্জন করা। তাদের উপর্যুক্ত সমস্যার জায়গায়গুলোতে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার কমে আসুক, তারুণ্যের হাসিতে হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠুক বিশ্ববিদ্যালয়- এই আশা করছি ।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।