পাবনার ঘি-ছানা যাচ্ছে বিশ্বের ১৫ দেশে

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ১২:৩০ পিএম, ৫ নভেম্বর ২০১৯ মঙ্গলবার

দুগ্ধ ভাণ্ডার খ্যাত পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে খাঁটি দুধে তৈরি ছানা ও ঘি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এখন কানাডা, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরাইন, দুবাই, কুয়েতসহ বিশ্বের ১৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে। ছানা ও ঘি বিদেশে রফতানি করে প্রতি বছর প্রায় ৩০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা গ্রামের রবি কুমার ঘোষ (৪৭) আইএ পাস করে বাপ-দাদার বংশক্রম ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। ইচ্ছা ছিল চাকরি অথবা অন্য পেশায় যাওয়ার, কিন্তু জাত ব্যবসা ধরে রাখার জন্য বাবা অমিত কুমার ঘোষের পরামর্শে রবি কুমার ঘোষকে ছানা ও ঘি তৈরির ব্যবসায়ে মনোযোগী হতে হয়। দাদা সরোজ কুমার ঘোষ ছিলেন বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলের নামকরা ছানা ও ঘি উৎপাদনকারী। পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় হাতে গোনা যে ৬০-৭০ জন ছানা ও ঘি উৎপাদক রয়েছেন তাদের মধ্যে রবি কুমার ঘোষ অন্যতম।

অন্যদের মধ্যে রয়েছেন সরোজিদ কুমার ঘোষ, দুলাল চন্দ্র ঘোষ, বিশ্বনাথ ঘোষ, পরিমল ঘোষ, পরিতোষ ঘোষ, দুলাল ঘোষ, রবি ঘোষ, মানিক লাল ঘোষ, নবরত্ন ঘোষ, মেজর ঘোষ, নব কুমার ঘোষ, রঞ্জিত কুমার ঘোষ, অধির কুমার ঘোষ, রঘু ঘোষ, পরিতোষ ঘোষ প্রমুখ।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় ছোট-বড় প্রায় ২২ হাজার দুগ্ধ খামার রয়েছে। এ ছাড়া গ্রামগুলোর প্রায় প্রতিটি বাড়িতে গরু পালন করে দুধ উৎপাদন করা হয়। এ অঞ্চলে প্রতিদিন ১৫ থেকে সাড়ে ১৬ লাখ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে দেড় লাখ লিটার বাঘাবাড়ী মিল্কভিটা, দুই লাখ ২৫ হাজার লিটার দুধ আফতাব, আকিজ, প্রাণ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং ঘোষরা ৫০ থেকে ৬০ হাজার লিটার দুধ ক্রয় করে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অবশিষ্ট দুধ প্রক্রিয়াজাত করে বগুড়া, রংপুর, নাটোর ও নওগাঁ জেলায় সরবরাহ করে থাকে।

পাবনার ফরিদপুরের ডেমড়া গ্রামের দুলাল ঘোষ জানান, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের ঘোষরা ৮০-৯০টি কারখানায় প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ৪০০ মণ দুধের ছানা তৈরি করেন। ওই পরিমাণ দুধে প্রায় ২৫০ মণ ছানা তৈরি হয়। এর মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ মণ ছানা স্থানীয় বাজারে বিক্রির পর বাকি ছানা চলে যায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলে।

তিনি বলেন, এক মণ দুধ থেকে আট কেজি ছানা ও তিন কেজি ফ্যাট (ননী) পাওয়া যায়। তিন কেজি ফ্যাট জ্বালিয়ে দেড় কেজি খাঁটি ঘি পাওয়া যায়। এ হিসাবে দু’টি জেলায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার ২০০ লিটার ঘি তৈরি হয়। দেশে বিদেশে পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে খাঁটি দুধের ছানা ও ঘির কদর দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

রবি কুমার ঘোষ জানান, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ থেকে প্রতিদিন এক শত মণের বেশি ছানা ও ২৫ মণ ঘি ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, খুলনা ও রাজশাহীতে পাঠানো হয়। সিলেট ও চট্টগ্রামে পাঠানো ছানা ও ঘির উল্লেখযোগ্য অংশ সেখানকার ব্যবসায়ীরা প্রক্রিয়াজাত করে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়।

ইংল্যান্ডে আলাউদ্দিন সুইটমিট, জলযোগসহ স্থানীয় কয়েকটি দোকানে এবং আমেরিকায় বনফুল, মধুবনসহ স্থানীয় কয়েকটি মিষ্টির দোকানে পাবনা ও সিরাজগঞ্জের তৈরি ছানা ও ঘির খুবই কদর রয়েছে। খাঁটি দুধ থেকে তৈরি ছানা ও ঘি এ অঞ্চলের চাহিদা পূরণ করে চলে যাচ্ছে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরাইন, দুবাই, কুয়েত, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ বিশ্বের ১৫টি দেশে।

দুধ, ছানা, মাখন দিয়ে তৈরি হয় ঘি, দই, মিষ্টি, খিরসাসহ বিভিন্ন মিষ্টান্ন দ্রব্য। পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ দই, মিষ্টি ও ছানা তৈরি হয়। এ তিনটি দুগ্ধজাত পণ্য বিদেশের মাটিতেও ভোজনবিলাসীদের কাছে সমান সমাদৃত।

জানা যায়, এ অঞ্চলে ছানা তৈরির কারখানার সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সে তুলনায় গাভী ও দুধের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ফলে দেশে বিদেশে চাহিদানুয়ায়ী ছানা ও ঘি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ সুযোগে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ভেজাল ও নকল ঘি তৈরি করে বাঘাবাড়ীর খাঁটি গাওয়া ঘি হিসেবে বাজারজাত করছে। এ ছাড়া নামী-দামি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের লেভেল লাগিয়ে ভেজাল ঘি বাজারজাত করা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে বিএসটিআই কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন।

পাবনা জেলার বেড়া, ডেমরা, পেচাকোলা, হাটুরিয়া, শরিষা, সেলন্দা, সানিলা, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর সিরাজগঞ্জ জেলার লাউতারা, পোতাজিয়া, বাঘাবাড়ী, শাহজাদপুর, সোনাতনী, তালগাছি, উলাপাড়াসহ ৫০টি এলাকায় সব চেয়ে বেশি ছানা ও ঘি তৈরি করা হয়। এ ছাড়া পাবনা ও সিরাজগঞ্জের নামকরা মিষ্টির দোকানগুলো চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ ছানা তৈরি করে থাকে। জেলা দু’টির মিষ্টির দোকানগুলোতে খাঁটি ছানা থেকে তৈরিকৃত মিষ্টি দ্রব্য বিক্রি হয় মাসে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার। এই মিষ্টি দ্রব্য তৈরির প্রধান উপাদানই হচ্ছে দুধ ও ছানা।

এ ছাড়া কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিন্মমানের ছানা ও ঘি উৎপাদন করে অল্প মূল্যে তা বাজারে বাঘাবাড়ীর গাওয়া ঘি হিসেবে বিক্রি করায় পাবনা-সিরাজগঞ্জে তৈরি আসল ছানা ও ঘির বাজারে কিছুটা ধস নেমেছে। ছানা ও ঘি উৎপাদকরা মনে করেন, সরকার এবং ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গুলো যদি ছানা ও ঘি উৎপাদক প্রতিষ্ঠানে তাদের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন তা হলে এ শিল্প থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়সহ যথেষ্ট কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।