পাবনায় পদ্মা-যমুনার ডুবোচরে পন্যবাহী ২২টি কার্গোজাহাজ আটকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৭:০৭ পিএম, ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ মঙ্গলবার

পাবনায় পদ্মা-যমুনা নদীতে নাব্যতা সঙ্কট মারাত্মক আকার ধারণ করায় পণ্যবাহী জাহাজ নৌ-বন্দরে পৌঁছাতে পাড়ছে না। মাঝ নদীতে আটকে পড়া জাহাজ থেকে লাইটারেজে করে রাসায়নিক সারসহ বিভিন্ন পণ্য বন্দরে আনা হচ্ছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত কাজীরহাটের প্রায় ৩ কিলোমিটার ভাটিতে রাজধরদিয়া, চরশিবালয় ও নাকালিচরে পদ্মা-যমুনার ডুবোচরে আটকা পড়েছে ২২টি পণ্যবাহী কার্গোজাহাজ।

ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় স্রোাতের টানে বালু ভাটিতে গিয়ে ডুবোচরের সৃষ্টি হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা ও ব্যবসায়ীরা দাবী করেছেন। অপরদিকে নৌ-চ্যানেল সচল রাখার জন্য নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে দ্রুত ড্রেজিং শুরু করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবী করেছে।

পাবনার কাজিরহাট ঘাট সুত্রে জানা গেছে, চট্রগ্রাম, নারায়নগঞ্জ ও মংলা বন্দর থেকে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা এম. ভি জুয়েল, এম.ভি ফেয়ারী, ওটি আছিয়া বেগম, এম.ভি সুমাইয়া হোসেন, এম.ভি ফয়সাল, এম.ভি ফয়সাল, এম.ভি ফয়সাল-৮, এম.ভি ইব্রাহীম খলিল, জুয়েল, আল তায়েফ, এম.ভি আফিফা, এম.ভি ওয়ারিশ আহনাফ, সততা পরিবহন, মাজননী, বিসমিল্লাহ, আছিয়া পরিবহন, ভাই ভাই, আবু ছালে সহ ২২টি জাহাজ রাজধরদিয়া, চরশিবালয় ও নাকালির চরের বিভিন্ন পয়েন্টে পদ্মা ও যমুনার ডুবোচরে আটকা পড়েছে। কার্গোজাহাজগুলো রাসায়নিক সার, কয়লা, গম ও চাল নিয়ে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে যাচ্ছিল।

এদিকে মোহনগঞ্জ থেকে কাজীরহাট পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার এলাকায় প্রায় ১৫-১৬টি ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় স্রোতের টানে বালু ভাটিতে গিয়ে ডুবোচরের সৃষ্টি হচ্ছে দাবী করে স্থানীয় বাসিন্দারা ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বিআইডব্লিউটিএ যমুনা ও পদ্মা নদীতে ড্রেজিং না করায় আটকে পড়া জাহাজের সংখ্য প্রায় প্রতি দিনই বাড়ছে।

বাঘাবাড়ী নৌবন্দর সূত্রে জানায়, দৌলতদিয়া-বাঘাবাড়ী নৌপথে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় জ্বালানী তেল, রাসায়নিক সারসহ অন্যান্য মালামাল পরিবহনের একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর মাধ্যম। এ নৌপথে জ্বালানী তেলবাহী ট্যাংকার, রাসায়নিক সার ও বিভিন্ন পণ্যবাহী কার্গো জাহাজ চলাচল করে। বাঘাবাড়ী বন্দর থেকে উত্তরাঞ্চলে চাহিদার ৯০ ভাগ জ্বলানী তেল ও রাসায়নিক সার সরবরাহ করা হয়। আবার উত্তরাঞ্চল থেকে বাঘাবাড়ী বন্দরের মাধ্যমে চাল ও গমসহ অন্যান্য পণ্যসামগ্রী রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। এ নৌপথের ৬টি পয়েন্টে নাব্যতা সঙ্কট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

বিসিআইসি’র বাঘাবাড়ী ট্রানজিট বাফার গুদাম সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের ১৪টি বাফার গুদামে রাসায়নিক সার চাহিদার ৯০ ভাগ বাঘাবাড়ী বন্দর থেকে যোগান দেয়া হয়। এখান থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার বস্তা রাসায়নিক সার সড়ক পথে বাফার গুদামগুলোতে সরবরাহ করা হয়। যমুনা নদীর নাব্যতা সঙ্কটে বাফার গুদামগুলোতে আপদকালীন সারের মজুদ গড়ে তোলার কাজ চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

বিসিআইসি’র বগুড়া আঞ্চলিক অফিস সূত্রে জানা যায়, ইরি-বোরো আবাদ মওসুমে উত্তরাঞ্চলে ১২ লাখ টন রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয়। প্রয়োজনীয় সারের বেশির ভাগই বাঘাবাড়ী বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়। পরে সেখান থেকে সড়ক পথে বাফারগুদামে পাঠানো হয়। বাফারগুদামগুলোতে আপদকালীন মজুদ আছে দুই লাখ ২৫ হাজার টন। বাঘাবাড়ী নৌরুটে নাব্যতা সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ায় আপদকালীন সার মজুদের কাজ কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিএ আরিচা অফিসের একটি সূত্রে জানায়, রাসায়নিক সার ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য ১০ থেকে ১১ ফুট পানির গভীরতা প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে এ নৌপথে কোথাও কোথাও ৮ থেকে ৯ ফুট পানির গভীরতা রয়েছে। আগামী ২-৩ সপ্তাহের মধ্যে পানির স্তর কমে ৭ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা। বাঘাবাড়ী নৌবন্দর থেকে দৌলতদিয়া পর্যন্ত নৌপথের চরসাফুল্লা, নাকালিয়া, নাকালী, রাজধরদিয়া, নগরবাড়ীসহ ৬টি পয়েন্টে নাব্যতা সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

এই সঙ্কট মারাত্মক আকার ধারণ করছে। সোমবার পর্যন্ত রাজধরদিয়া, চরশিবালয় ও নাকালী পয়েন্টে ডুবোচরে ২২টি পণ্যবাহী জাহাজ আটকা পড়েছে। বাঘাবাড়ী নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ ড্রেজিংয়ের জন্য বিআইডাবি¬উটিএ’র ড্রেজিং বিভাগকে চিঠি দিয়েছে। বাঘাবাড়ী নৌবন্দরমূখী রাসায়নিক সারসহ অন্যান্য পণ্যবাহী কার্গোজাহাজ পূর্ণলোড নিয়ে বন্দরে পৌছাতে পারছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ড্রেজিং শুরু না করায় নাব্যতা সঙ্কট মারাত্মক আকার ধারন করছে।

পণ্যবাহী কার্গোজাহাজ এম,ভি বিজয় এর মাষ্টার মোঃ জহির উদ্দিন স্বপন জানান, দৌলতদিয়া থেকে বাঘাবাড়ী নৌবন্দর পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটার নৌপথের ৬টি পয়েন্টে পানির গভীরতা কমে দাড়িয়েছে ৭ থেকে ৯ ফুট। সরু হয়ে গেছে নৌচ্যানেল। মোহনগঞ্জ, পেঁচাকোলা পয়েন্ট কার্গোজাহাজ চলাচলের জন্য সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এ পয়েন্টে দুটি জাহাজ পাশাপাশি চলাচল করতে পারছে না। ওই পয়েন্টে জেগে উঠা চরের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় দিনদিন চ্যানেলটি আরো সরু হয়ে যাচ্ছে। এই পয়েন্টে দ্রুত ড্রেজিং না করা হলে পণ্যবাহী ও জ্বালানী তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিপিসি’র বাঘাবাড়ী রিভারাইন অয়েল ডিপোর যমুনা কোম্পানির ম্যানেজার এ, কে, এম জাহিদ সরোয়ার জানান, বাঘাবাড়ীতে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তিনটি তেল কোম্পানির ডিপোতে পর্যাপ্ত পরিমান জ্বালানী তেল মজুদ আছে। বর্তমানে উত্তরাঞ্চলে জ্বালানী তেল সঙ্কটের আশঙ্কা নেই। যমুনা ও পদ্মা নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা সঙ্কট নিরসনের জন্য বিআইডাবি¬উটিএ’কে চিঠি দেয়া হয়েছে।

তিনি আরো জানান, প্রতিবছরই এসময় দৌলতদিয়া থেকে বাঘাবাড়ী নৌপথে নাব্যতা সঙ্কট দেখা দেয়। বিআইডাবি¬উটিএ আরিচা অফিস তাদের জানিয়ে বর্তমানে এ রুটে ৭ থেকে ৮ ফুট পানির গভীরতা রয়েছে। নৌ-চ্যানেল সচল রাখার জন্য যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে দ্রুত ড্রেজিং শুরু করা হবে।