Advertisement

পেঁয়াজ চাষে লবণের ব্যবহার, লাভ না ক্ষতি?

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৩:৫৪ পিএম, ২৪ নভেম্বর ২০১৯ রবিবার

গত মৌসুমে ভালো দাম পাওয়ায় এবার পেঁয়াজের চাষ বেড়েছে নাটোরে। চাষিদের আগ্রহ বাড়ায় লক্ষ্যমাত্রাও বাড়িয়েছে কৃষি বিভাগ। গত বছর জেলায় ৩ হাজার ৩৮০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও এবার ৩ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পোকার আক্রমণ রোধ, আগাছা দমন ও অধিক ফলনের আশায় অনেকে জমিতে লবণ ব্যবহার করছেন। খোলা বাজারে সস্তায় যে খাওয়ার লবণ পাওয়া যায়, সেই লবণই ফেলা হচ্ছে পেঁয়াজের জমিতে।

তবে কৃষিবিদরা বলছেন, জমিতে লবণ দেওয়া আসলে কোনও বিজ্ঞানসম্মত পন্থা নয়। এর ফলে জমির উর্বরতাশক্তি হ্রাসসহ দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। তবে কৃষকদের বিশ্বাস, জমিতে লবণ দিলেই তাদের ফলন বাড়বে।

স্থানীয় কীটনাশক বিক্রেতা জেকের জানান, প্রায় ১৫-২০ বছর ধরে অনেক কৃষক পেঁয়াজের চাষে লবণ ব্যবহার করেন। কৃষি বিভাগ অনেক আগে থেকেই বিষয়টি জানে। তারা লবণ ব্যবহারে বিরত থাকতে বললেও কৃষকরা তা শুনছেন না।

তিনি আরও জানান, ইউরিয়া ও পটাশের বিকল্প হিসেবে লবণ ব্যবহার করা যায় এমন বিশ্বাস রয়েছে কৃষকদের। স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হয়, লবণ ব্যবহার করলে পেঁয়াজের চারাগুলো সতেজ ও কালো বর্ণের হয়। আর ভেতরে কোনও কীট থাকলে তা মারা যায়। ফলে ফলন ভালো হয়।

শরকোতিয়া গ্রামের এক কৃষক জানান, জমির উর্বরতা শক্তি কম থাকলে লবণ ব্যবহার করা হয়। এতে ফলন ভালো হয়।

নলডাঙ্গা উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, তাহেরপুর এলাকায় পেঁয়াজের চাষে লবণের ব্যবহার হয়। ওখান থেকেই মূলত নলডাঙ্গা উপজেলার বিপ্রবেলঘরিয়া,মাধনগর ও ব্রক্ষ্মপুর ইউনিয়নের প্রায় ৫০-৬০ ভাগ কৃষক জমিতে লবণ ব্যবহার করেন। তবে লবণের ব্যবহার করা শুরু করলে প্রতি বছরই করতে হয়, নইলে কোনও ফসলই ফলানো যায় না, আবার জমির উর্বরতা শক্তি কমে যায় জানার পরও অনেক কৃষক গোপনে লবণ ব্যবহার করেন।

লক্ষীকোল এলাকার কৃষক তোফাজ্জল জানান, তিনি এক একর জমিতে পেঁয়াজের চাষ করেছেন। এখন চলছে নিয়মিত পরিচর্যা। তবে কন্দ পেঁয়াজের বীজ ৮ হাজার টাকা মণ কিনলেও এখন বীজের দাম ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা মণ। যদিও তার পেঁয়াজ আগাম ওঠে, তবে দাম ভালো পাওয়া গেলে লাভবান হবেন।

সোনাপাতিল গ্রামের কৃষক মানিক,আসাদ ও সোহরাব জানান, কন্দ পেঁয়াজের পাশাপাশি তারা চারার জন্য বীজতলায় বীজ বপন করছেন। প্রায় ২০ দিন পর কন্দ পেঁয়াজ থেকে ফলন তুলে বাজারে বিক্রি করা যাবে। আর এক মাস বয়স হলেই চারা তুলে জমিতে লাগানোর পাশাপাশি বিক্রি করা যাবে। এখানকার চারা পাবনা, সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন জেলার কৃষকরা কিনে নিয়ে যান।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সুব্রত কুমার জানান, এখন জেলার বিভিন্ন উপজেলায় একইসঙ্গে পেঁয়াজ চাষ, পরিচর্যা আর চারা রোপণে বীজ ছিটানোর কাজে ব্যস্ত কৃষকরা। ১৫-২০ দিন আগে শুরু হয়েছে কন্দ পেঁয়াজ চাষ।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম জানান, এবারে উপজেলায় পেঁয়াজ চাষে কৃষক আর জমির ব্যবহার দুটোই বেশি।

জমিতে লবণের প্রসঙ্গে তিনি জানান, পেঁয়াজের জমিতে লবণ ব্যবহারের উপকারিতা নেই বরং ক্ষতি রয়েছে। এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

কৃষকরা প্রতি কাঠা জমির বিপরীতে দুই থেকে আড়াই কেজি পর্যন্ত লবণ ব্যবহার করছেন জানিয়ে নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সুব্রত কুমার জানান, এটি স্রেফ গুজব। নলডাঙ্গা উপজেলাটি ভৌগোলিকভাবে রাজশাহীর তাহেরপুর এলাকার সীমান্তে সংযুক্ত। তাহেরপুর এলাকার কৃষকরা দীর্ঘদিন থেকে ধানের জমিতে লবণ ব্যবহার করতেন। সেখানকার কৃষকদের কাছ থেকেই নলডাঙ্গা এলাকায় লবণের ব্যবহার শুরু হতে পারে।

সুব্রত কুমার আরও বলেন, ‘আবাদের জন্য সোডিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহারের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বরং পটাসিয়াম,জিপসাম,সালফার ইত্যাদির ব্যবহার রয়েছে। কৃষকরা জমিতে লবণের ব্যবহার করলে খুলনা এলাকার মতো তাদের জমিগুলো চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়বে।’

আরও জানানো হয়, বিষয়টি কৃষকদের বোঝাতে ২৬ ও ২৭ নভেম্বর এ বিষয়ে এক উদ্বুদ্ধকরণ সভা হবে, রাজশাহী থেকে মৃত্তিকা গবেষণা কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত থাকবেন। ওই সভার মাধ্যমে কৃষকদের লবণের ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।