‘ভালোবাসা যেখানে সত্য’

ডা. আসিফ ইকবাল

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ১১:৪৬ পিএম, ১১ মে ২০১৯ শনিবার

ডা. আসিফ ইকবাল

ডা. আসিফ ইকবাল

আটাশ নাম্বার ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি ভয়াবহ অবস্থা। ডা. রিম্পি ও ডা. ডাঃ মৌ রোগীকে CPR দিচ্ছে। Post Caesarean Complication এর রোগী। ড্রেইন টিউব দিয়ে অনবরত রক্ত আসছে। পেরিফেরাল পালস পাওয়া যাচ্ছেনা, ক্যারোটিড পালস একদম ফিবল। চলছে CPR, Fluid, Dopamine এর খেলা।

রিম্পি এবং মৌ এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে ঘামছে দরদর করে, চোখে মুখে রাজ্যের উৎকন্ঠা। ধীরে ধীরে পালস ফিরে আসছে। তারপর আমি আর ডা. স্বচ্ছ CPR দেয়া শুরু করলাম। পালস বিপি এখন স্ট্যাবল। ডা. ফারহানা আপু রোগীর লোককে ওষুধ পত্র কিনতে দিয়ে প্রস্তুত হচ্ছেন অপারেশনের জন্য। ব্লাড-ডিমান্ড দেয়া হয়েছে তিনব্যাগ।

নওগাঁ জেলার প্রত্যন্ত কোন এক গ্রামের রোগীর লোক অনেক কষ্টে এক ব্যাগ রক্ত জোগাড় করতে পারলো। আরো দুই ব্যাগ ছাড়া অপারেশন শুরু করা যাবেনা।

উপায় না দেখে স্বচ্ছকে জানালাম রোগীর রক্ত আর আমার রক্তের গ্রুপ এক। স্বচ্ছের ডাকে সন্ধানী থেকে ছুটে আসলো ছোটবোন তন্বী। এক ব্যাগ রক্ত দিয়ে রোগীর কাছে গিয়ে দেখি অবস্থার আবার অবনতি। পালস বিপি নন রেকরডেবল। আবার CPR দেয়া শুরু করলাম, চলছে যমে মানুষে টানাটানি। আমাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে রোগী ওপারে চলে গেলো। রক্ত দিয়ে বিশ্রাম না নেওয়ার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে মাথা ঘুরছিল একটু একটু। শেষবারের মত পালস বিপি মাপতে গেলাম ডেথ ডিক্লেয়ার করার জন্য।

হঠাৎ টের পেলাম মাথায় রোগীর মায়ের হাতের স্পর্শ। কাঁদতে কাঁদতে আমার মাথায় সরিষার তেল লাগিয়ে দিচ্ছে পরম মমতায় আর বলছে বাবা আমার মেয়ের জন্য তুমি নিজের রক্ত দিয়েছো, আজ থেকে তুমি আমার ধর্মব্যাটা। ধর্মব্যাটা বানাতে হলে আগে প্রথমে মাথায় তেল লাগিয়ে দিতে হয়-এটা তাদের লৌকিক নিয়ম। স্বজন হারানো মানুষের কোন সান্ত্বনা হয়না। আমি শুধু মৃদু স্বরে বললাম, দোয়া করবেন আমার জন্য আম্মা।

আমি জানি ডাক্তার-পেশেন্ট রিলেশনশিপের এমন অপূর্ব নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বাংলাদেশের প্রত্যেক হাসপাতালের আনাচে-কানাচে। রোগীর স্বজনের দোয়া আর ডাক্তারের প্রচেষ্টা বিফল করে দিয়ে স্রষ্টা মহাকালের গল্প বুনে যাচ্ছেন নিজস্ব নিয়মে। ডাক্তার পাচ্ছেন বিশুদ্ধ ভালোবাসা, অচেনা-অজানা অনাত্মীয় মানুষের প্রানভরা দোয়া।

পৃথিবীর আর কোন পেশায় নেই একজন মানুষের অন্তিম মুহূর্তে এভাবে পাশে থাকার সৌভাগ্য, সৎ পথে এতটা স্বচ্ছল ভাবে জীবনযাপন করার সুযোগ।

রাষ্টযন্ত্র, প্রশাসন, মিডিয়া আমাদের বিপক্ষে থাকতে পারে সাধারণ মানুষকে আমরা পাশে টেনে নিতে পারি অল্প একটু সহানুভূতি ও ভালোবাসা দিয়ে।

আমি তাই চিকিৎসক হতে চাই এই জন্মে এবং পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে সেখানেও।

লেখক: চিকিৎসক, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ