ভালো নেই ডালের রাজধানী বানেশ্বরের মিলমালিকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৭:০৩ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০২০ বুধবার | আপডেট: ০৭:০৫ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০২০ বুধবার

রাজশাহীর বানেশ্বর দেশের ডাল উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। এখান থেকেই সারাদেশের ৬০ শতাংশ ডালের চাহিদা পূরণ হতো। কিন্তু ঋণের জালে পড়ে এই ডাল উৎপাদনে ব্যঘাত ঘটছে। বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত ২৫০ টি ডাল কারখানা। কোন রকমে এখনো টিকে আছে অর্ধশত কারখানা। গত ৫ বছরে বানেশ্বরের ব্যবসায়ীরা প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বেকার হয়েছেন প্রায় ৮ হাজার মানুষ।

ব্যবসায়ীরা জানান, ১৯৮০ সাল থেকে বানেশ্বরের গড়ে উঠতে থাকে ডালের মিল। ২০১৫ সাল পর্যন্ত এখানে প্রায় ৩০০ ডাল মিল ছিলো। এই মিলগুলো থেকে উৎপাদিত ডালেই দেশের ৬০শতাংশ চাহিদা পূরণ হতো। প্রায় ৫বছর ধরে দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো বিদেশ থেকে ডাল এনে কম দামে বিক্রি করতে শুরু করে দেশের বাজারে। এতে দেশী ডালের বাজারে ধ্বস নামে। এতেই লোকসানগুণে অনেক ব্যবসায়ী তাদের পুঁজি হারিয়ে বসেন। অনেকেই ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় নেমেও আর প্রতিযোগীতায় কুলিয়ে উঠতে পারেননি। এভাবেই দিনে দিনে বন্ধ হয়ে যায় কারখানাগুলো। এখন যে কারখানাগুলো টিকে আছে, তারাও কোটি কোটি টাকা ঋণগ্রস্ত ব্যাংকের কাছে। এঅবস্থায় অনেকেই ভর্তুকি দিলে চালাচ্ছে কারখানাগুলো। 

বানেশ্বরের রূপালি ডাল মিলের মালিক জালাল উদ্দীন জানান, ২৫ বছর ধরে ডাল প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করে আসছেন তিনি।  আগে কৃষকের কাছ থেকে তিনি ডাল কিনে নিজের মিলে প্রসেসিং করে বাজারজাত করতেন। গত ৩বছর ধরে লোকসান গুণতে গুণতে পুঁজি হারিয়ে মিলটি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে তিনি পুঁজি হারিয়ে ঋণের জালে এখন জর্জরিত। ব্যাংকে তার ঋণ জমেছে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা। 

শুধু এক জালাল নন, তার মতোই আরো প্রায় দুই শতাধিক ডাল ব্যবসায়ী হারিয়েছেন তাদের জৌলুস। উল্টো সম্বল ও পুঁজি হারিয়ে অনেকেই হয়েছেন নিঃস্ব।

বানেশ্বরের বিপ্লব ডাল মিলের মালিক আলতাফ হোসেন ২০০৭ সাল থেকে ডাল প্রসেসিং ও বাজারজাত শুরু করেন। তিনিও পুঁজি হারিয়ে ব্যাংকের ঋণে জর্জরিত হয়ে গেছেন। তার ব্যাংকে ঋণ রয়েছে ৫০ লাখ টাকা।

ব্যবসায়ীরা জানান, শুরুতে রাজশাহী ছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনার ঈশ্বরদী, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ, ফরিদপুর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া থেকে কৃষকদের কাছ থেকে ডাল কিনে আনতেন বানেশ্বরের ব্যবসায়ীরা। এতে করে ডাল মিল মালিকরা প্রচুর পরিমাণে লাভবান হতে থাকেন। তাদের লাভবান হবার বিষয়টি অন্যদের নজরে এলেও তারাও শুরু করে ডাল মিলের ব্যবসা। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই বানেশ্বরের ছোট্ট একটি এলাকায় গড়ে উঠে প্রায় ৩০০ ডাল মিল। ব্যাংকগুলোও তাদের ঋণ দিয়ে উৎসাহ দিতে থাকে। কিন্তু ২০১৩ সালের দিকে দেশের প্রতিষ্ঠিত মেঘনা গ্রুপ, ফ্রেস, সিটি গ্রুপ, ডিকে গ্রুপ, এসি আই গ্রুপসহ বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে মোটা দানার ডাল ক্রয় করে কমমূল্যে বাজারে ছাড়তে থাকে। তখন থেকেই ডালের বাজারে ধ্বস নামতে থাকে। ২০১৫ সালের শেষ দিকে এসে বাজার পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়। তারপরই একের পর একে ডাল মিল বন্ধ হয়ে যায়। 

মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত পাঁচবছর ধরে বড় বড় কোম্পানির সিন্ডিকেট করে এলসির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা থেকে মোটা দানার মসুরের ডাল, মুগ ডাল কিনে এনে দেশী ডালের অর্ধেক দামে বিক্রি করতে থাকে। ফলে দেশি ডালের দামেও ধ্বস নামে যাচ্ছে। দাম কম হওয়ায় গুদামে দেশি ডাল অবিক্রিত পড়ে থাকছে। এছাড়া ব্যাংকের চড়া সুদও ঋণের জালে জর্জরিত হওয়ার একটা বড় কারণ। 

মেসার্স নর্থবেঙ্গল ডাউল মিলের সত্ত্বাধিকারী সেলিম রেজা বলেন, এখানকার ৩০০ মিলে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিলো। এখন মিলগুলো বন্ধ হওয়ায় প্রায় ৮হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন।

বানেশ্বর আঞ্চলিক ডাল ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ওবায়দুর রহমান বলেন, গত পাঁচবছরে বানেশ্বরের ব্যবসায়ীরা প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমার নিজের ক্ষতি হয়েছে ২০ কোটি টাকা। ভর্তুকি দিয়ে মিল চালাতে হচ্ছে। সরকারকে এসব ক্ষতি পূরণে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকের সুদ মওকুফ করলে ব্যবসায়ীরা অনেকটাই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে। এতে ডালমিলে আবারো কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসবে। বেকার শ্রমিকরাও কাজ পাবেন।