ভয়কে জয় করে লড়ছেন প্রায় দেড় লাখ চিকিৎসাযোদ্ধা

ডেস্ক নিউজ

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ১১:১১ এএম, ২৬ এপ্রিল ২০২০ রবিবার

দেশে এ পর্যন্ত ৫০০ জনের বেশি চিকিৎসাকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও দমে যাননি অন্য হাজারো চিকিৎসাকর্মী। মারা গেছেন একজন চিকিৎসক ও একাধিক স্বাস্থ্যসেবাকর্মী। তার পরও বাকিরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই মানুষকে বাঁচাতে কাজ করে চলছেন নিরলস। নিজেরা সংক্রমিত হওয়ার ভয়, পরিবার-পরিজনের পিছুটান উপেক্ষা করেই চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী পর্যন্ত সবাই কাজ করে চলেছেন আক্রান্ত বা আক্রান্ত সন্দেহজনক রোগীদের সেবায়।

শুরুতে চিকিৎসকদের মধ্যে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা উপকরণ নিয়ে সংশয় থাকলেও ধীরে ধীরে তা কেটে গেছে। বরং যা আছে তাই নিয়েই করোনাযুদ্ধে জয়ী হতে মনোবল শক্ত করে লড়াই করছেন তাঁরা। রাজধানী থেকে শুরু করে উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যন্ত সব পর্যায়েই নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানুষের সেবায় কাজ করছেন চিকিৎসাকর্মীরা।

এগিয়ে এসেছেন দেশের হোমিওপ্যাথিক ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকরাও। সরকারিভাবে তাঁদেরও সক্রিয় করা হয়েছে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। বিশেষ করে যাঁরা যেখানেই মানুষের চিকিৎসাসেবায় জড়িত ছিলেন কেউ যেন ঘরে বসে না থেকে নিজ নিজ দক্ষতা ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের সেবায় নিয়োজিত হন সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, সব মিলিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রায় দেড় লাখ চিকিৎসাকর্মী এই মুহূর্তে যুক্ত আছেন করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যেই সারা দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা করোনাভাইরাস প্রতিরোধী সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের তালিকা চেয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, সারা দেশে সরকারি প্রায় এক লাখ চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কভিড-১৯- এর চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবায় সরাসরি নিয়োজিত আছেন। তবে এটি আরো নিশ্চিত করা যাবে মাঠের তথ্য পাওয়া গেলে। এর বাইরে বেসরকারি পর্যায়ে অ্যালোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক ও আয়ুর্বেদিক মিলিয়ে আরো প্রায় ৫০ হাজারের মতো চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করে চলেছেন, যাঁদের সবারই কমবেশি অবদান রয়েছে করোনাভাইরাসজনিত চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবায়।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ  বলেন, এ ধরনের মহামারির ক্ষেত্রে চিকিৎসকরাই হচ্ছেন মূল ভরসা। তাঁদের ওপরই অন্য সবার ভরসা রাখা জরুরি। এখন করোনাভাইরাস মোকাবেলায় চিকিৎসকরাই কিন্তু রোগীদের কাছে থেকে সেবা দিচ্ছেন। তাঁদের অন্যান্য চিকিৎসকর্মীরা সহায়তা দিচ্ছেন। ফলে এককথায় চিকিৎসকর্মীদের কাজে সাহস জোগাতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ  বলেন, ‘চিকিৎসকদের নিয়ে অনেকে সমালোচনা করে, কিন্তু সবার এটা ভাবা উচিত যে তাঁরাই এই করোনাযুদ্ধে একেবারে সামনের সারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করছেন। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তাঁরা আমাদের নির্দেশনা অনুসারে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই রোগীর পাশে থাকছেন, চিকিৎসা দিচ্ছেন। পাশের সহকর্মীকে আক্রান্ত হতে দেখেও অন্য রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাই তাঁদের কেবল দোষারোপ না করে সাহস জোগানো উচিত, প্রশংসা করা উচিত। আর সেদিকে নজর রেখেই প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসাকর্মীদের জন্য নানা প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন।’

মহাপরিচালক বলেন, চিকিৎসকদের মধ্যে ক্ষুদ্র একটি স্বার্থান্বেষী মহল হীন উদ্দেশে বেশির ভাগ আত্মপ্রত্যয়ী চিকিৎসকদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার মতো নানা তৎপরতা চালাচ্ছে। সরকার সেদিকেও নজর রাখছে। চিকিৎসক নেতারাও চিকিৎসাকর্মীদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছেন সরকারের সঙ্গে মিলে।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, ‘সারাক্ষণ সমালোচনা করে চিকিৎসকদের মন খারাপ করে দিলে বরং রোগীদের জন্যই খারাপ হয়। বরং সবার উচিত চিকিৎসকদের পাশে থাকা তাঁদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য। তবেই চিকিৎসকরা রোগীদের পাশে থেকে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লড়ে যেতে পারবেন।’ তিনি বলেন, হয়তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোনো কোনো চিকিৎসকের কিছু সমস্যা হতে পারে। সেটাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবেই দেখা উচিত।

ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিকল্প চিকিৎসা বিভাগের লাইন ডিরেক্টর ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী চিঠি দিয়ে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ও ওষুধের বিষয়ে করোনার উপসর্গধারী মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো ও প্রয়োজনমতো তা ব্যবহারের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের চেয়ারম্যান ডা. দিলীপ রায়  বলেন, ‘আমরা সরকারের নির্দেশনা অনুসারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে একযোগে কাজ করছি। আমাদের ৬৯টি হোমিওপ্যাথি কলেজ ও কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রতিদিন স্থানীয় রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এ ছাড়া দেশে প্রায় ৬০ হাজার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক তাঁদের নিয়মিত প্র্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকদের মতোই পিপিই ব্যবহার করে রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। এই সেবা দিতে গিয়ে ইতিমধ্যেই আমাদের বেশ কিছুসংখ্যক চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন। তবু আমরা থেমে নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সর্দি, জ্বর, গলা ব্যাথার মতো চিকিৎসায় নিয়মিত ওষুধের পাশাপাশি কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক হোমিওপ্যাথি বোর্ডের নির্দেশনামতো আর্সেনিক জেনেরিকের একটি ওষুধ ব্যবহার করতে শুরু করেছি রোগীদের জন্য।’