মহান মে দিবস আজ

ডেস্ক নিউজ

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ১০:০৪ এএম, ১ মে ২০২০ শুক্রবার | আপডেট: ১০:০৫ এএম, ১ মে ২০২০ শুক্রবার

প্রাপ্তি শব্দটি খুব সুমধুর। শব্দটি শুনতে বা গ্রহণ করতে প্রত্যেকেরই ভালোলাগা কাজ করে; কিন্তু প্রাপ্তির পেছনের রহস্য ঘাটলে ভালোলাগার চেয়ে শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয় বেশি।

যে কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক দিবসের পেছনের ইতিহাসগুলো ততটাই মর্মান্তিক যতটা না আমরা আমাদের মধ্যে জাতীয় দিবসগুলোকে ধারণ করতে পারি। তেমনি ব্যতিক্রম নয় মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। দিনটির পেছনে রয়েছে ১১ শ্রমিকের তাজা রক্ত ও হাজার মানুষের বুক ফাটা আর্তনাদ।

পহেলা মে, যা মহান আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ১৮৮৬ সালের এই দিনে শ্রমিকরা আট ঘণ্টা কাজের অধিকারের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের সব শিল্প এলাকায় ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। আন্দোলন চলাকালে শিকাগোর হে মার্কেটের সামনে বিশাল শ্রমিক জমায়েতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ১১ শ্রমিক।

এরপরই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে ঐ শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। গড়ে ওঠে শ্রমিক-জনতার বৃহত্তর ঐক্য। তীব্র আন্দোলনের মুখে শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। অধিকার আদায়ে শ্রমিকদের আত্মত্যাগের স্মরণে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে দিনটিকে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মে দিবস, শ্রমিক দিবস বা বিশ্ব শ্রমিক দিবস—যে নামেই ডাকা হোক না কেন, দিনটি বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান-সংহতি জানানোর দিন হিসেবেই পালিত হয়ে আসছে ১৯০৪ সাল থেকে। বাংলাদেশেও এই দিবসটি আড়ম্বরপূর্ণভাবে উদ্যাপন করা হয়; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশের শ্রমিকদের সমাজ কটটুকু শ্রদ্ধা বা সম্মান দেয় এ বিষয়ে এখনো নানা মতভেদ রয়েছে।

কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে গণপরিবহন, হাট-বাজার, সমাজ—কোনো জায়গাতেই শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না। কারণ আমরা এখনো বেশভূষা দেখেই মানষকে মূল্যায়ন করি।

আমাদের দেশে ইতিমধ্যে কলকারখানা পোশাকশিল্পে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু দুর্ঘটনা থেকে লক্ষ করা যায়, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়টিতে বাংলাদেশে এখনো সন্দিহান। এছাড়াও মজুরির দিকটিতেও বাংলাদেশের শ্রমিকরা আশাহত। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরেও ন্যায্য মজুরি তাদের কাছে অনেকটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

বিশ্বের তৈরি পোশাকশিল্পের বড়ো বড়ো কারখানার পাঁচ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) চার দিনে যে আয় করেন, তা বাংলাদেশের একজন নারী পোশাকশ্রমিকের সারা জীবনের আয়ের সমান।

আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী ব্যক্তি মালিকানা নির্বিশেষে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা প্রণয়ন, নিরাপদ কর্মস্থল, শোভন কাজ ও শোভন মজুরি নিশ্চিত করা, রেশন প্রথা চালু, নারী শ্রমিকদের সমকাজে সমমজুরি, সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সুলভে বাসস্থান, কারখানা ভিত্তিক হাসপাতাল এবং বিনামূল্যে চিকিত্সাব্যবস্থা করে শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করে শ্রমিকদের সুবিধা দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

বড়ো বড়ো বিল্ডিং প্রকল্পে প্রতিবছর অনেক শ্রমিক উঁচু উঁচু ভবন থেকে পড়ে বা বিভিন্ন ওয়েল্ডিং দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। কিন্তু দরিদ্র পরিবারকে ঐ সময় যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না। কিছু টাকা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সেই সব পরিবারের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরা অহরহ নানা বিভ্রান্তিতে অভ্যস্ত। একজন নারী শ্রমিকের কাছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনা।

অসাধু মালিক প্রতিনিয়ত দারিদ্র্যতার সুযোগ নিয়ে নারীদের হয়রানি করছে। বিচার চাইতে গেলে চাকরি হারাতে হয়। পেটের দায়ে মুখবুজে সব নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছে হাজার হাজার নারী শ্রমিক। প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে শারীরিক মানসিক নির্যাতিত হয়ে ফিরে আসছে অনেক নারী শ্রমিক; কিন্তু সরকার এসব নির্যাতনের কোনো বিচার করে না বললেই চলে।

বিশ্বে মানবসভ্যতা গড়ে উঠেছে মানুষের শ্রমের বিনিময়ে। এক্ষেত্রে এক পক্ষের দিকনির্দেশনায় অপর পক্ষের কায়িক শ্রমে গড়ে ওঠে শিল্প, উত্পাদিত হয় নানা সামগ্রী। শ্রমিক ছাড়া উত্পাদন হতে পারে না। আবার শ্রমিকের আয়-রোজগারেরও উত্স তাদের এই শ্রম।

মালিকরা শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করে মুনাফা ও আয়-উপার্জনের জন্য; কিন্তু শ্রমিক ছাড়া কারখানা অচল। তাই শ্রমিক-মালিক স্ব স্ব স্বার্থে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। রানা প্লাজা, তাজরীন গার্মেন্টসহ সাম্প্রতিক সময়ে শিল্প দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দোষী ব্যক্তিদের বিচার এখনো হয়নি। এসব দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বিকলাঙ্গ হয়েছে শত শত পরিবার।

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। একটি দেশের উন্নয়নের অন্তরালে থাকে শ্রমিক-মজুরদের অক্লান্ত পরিশ্রম, ব্যথা-বেদনা। কিন্তু সে অনুযায়ী শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে না। যাদের ঘামে একটি একটি ইট সাজিয়ে বড়ো বড়ো ইমারত সদৃশ দেশ এগিয়ে যাচ্ছে তাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া আবশ্যক। শ্রমিকদের যথাযথ মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হতে হবে সব শ্রমজীবী মানুষের অধিকার হোক সুপ্রতিষ্ঠিত এবং পৃথিবী হোক শান্তিময়।

স/র