মৃত্যু চাই না টেলিভিশনের

ফয়েজ রেজা

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৯:৪৫ এএম, ৩ এপ্রিল ২০১৯ বুধবার

ফয়েজ রেজা

ফয়েজ রেজা

অন্যের ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে যদি কেউ তৃপ্তি পান, তাহলে তিনি তা খেতেই পারেন, এটি তার নিজস্ব রুচির বিষয়। হোটেল-রেস্তোরাঁয় ‘ঝুটা’ খাবার বিক্রি করা যায় না, কারণ আইনের চোখে এটি অন্যায়, অপরাধ। কারও গায়ে দেওয়া পুরনো জামা-জুতা কেউ পরতেই পারেন, এটিও তার নিজস্ব অভিরুচি ও ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। তাই বলে পুরনো জামাকে নতুন জামা বলে বাজারে বেচা যায় না। কারণ এটিও হঠকারিতা, এটিও অন্যায়, অপরাধ।

বাসি-পচা খাবার আর ছেড়াফাঁড়া জামা, জুতা, ঘড়ি, মোজা নতুন মোড়কে বেচা অন্যায়। অথচ টেলিভিশনে পুরনো বিদেশি অনুষ্ঠান নতুন ‘ডাবিং’ করে দেখানো বৈধ! খাবারের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়, কাপড়ের স্থায়িত্ব কমে, ভাষার বিবর্তন ঘটে, সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়, অথচ ‘ডাবিং’ করা অনুষ্ঠান চিরযৌবনা নায়িকার মতো, প্রদর্শিত হচ্ছে টেলিভিশনে। বিদেশি তেল, নুন, চিনি, ডাল আমদানি করলে আমাদের দেশপ্রেম চাঙে ওঠে আর টেলিভিশনে বিদেশি অনুষ্ঠান আমদানি করে দেখালে দেশপ্রেম চাঙা হয়! সংস্কৃতি প্রেম জেগে ওঠে।

বাংলাদেশের অনুষ্ঠান নির্মাতারা মেধাহীন, নাটক নির্মাতারা দুর্বল, শিল্পী-কুশলীরা জানে না কীভাবে দর্শক রুচি ধরতে হয়- এসব অসন্তোষ লোকমুখে শোনা যায়। অনেকে মনে করেন, দর্শকের চোখের কথা আর মনের ভাষা বোঝে না নির্বোধগুলো! তাই যদি সত্যি হয়, এত মেধাহীন মানুষ নিয়ে একটি দেশ কী করে বেঁচে আছে? সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংস্কৃতি কি হুমকির সম্মুখীন নয়?

 

আমাদের কবিতায় প্রাণ নেই, একথা বলে কি বিদেশ থেকে কবিতা কিনে সারাদেশে বিতরণ করা হচ্ছে? না, হচ্ছে না। নিজের সন্তান অপদার্থ বলে কি আমরা অন্যের সন্তানের মাথায় তেল মাখছি? তা তো মাখছি না। তাহলে দেশের মেধাবী নির্মাতাদের মেধাহীন উপাধি দিয়ে বিদেশি সংস্কৃতির কল্পিত ধারাবাহিক কল্পকাহিনি ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হলো কেন?

বিদেশি সাংবাদিক সাইমন ড্রিং এদেশে এসে যখন একুশে টেলিভিশন শুরু করেছিলেন, তিনি একাই এসেছিলেন। বিদেশ থেকে ব্রিফকেস ভরা টাকা, উড়োজাহাজ ভরা মানুষ, নামিদামি প্রশিক্ষক আর সাংবাদিক আনেননি। তারপরও এদেশের উদ্যমী তরুণ সাংবাদিকদের প্রচেষ্টা ও নতুন নতুন উদ্ভাবনী পরিকল্পনার সুবাদে সংবাদ পরিবেশনে নতুনত্ব আর দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরে নির্মিত নানান অনুষ্ঠান আকৃষ্ট করেছিল দর্শকদের। তবে শুরু থেকেই একুশে টেলিভিশনে বিদেশি সিরিজের আদিখ্যেতা ছিল, দেখানো হতো ডাবিং সিরিয়াল ‘নূরজাহান’সহ বেশকিছু ডাবিং সিনেমা, সিরিজ, কার্টুন। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে আকৃষ্ট করা অথবা তখন ডিশ সংযোগ নেই এমন দর্শকদের আকৃষ্ট করার জন্যই হয়তো বিদেশি ডাবিং সিনেমা বা সিরিয়াল দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

একসময় সিনেমা ও বিদেশি সিরিজ দেখিয়ে সিনেমা হল বিমুখ দর্শকদের চোখ নিজেদের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করেছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। তখন দেখানো হতো বিদেশি ডাবিং সিরিজ। ‘ম্যাকগাইভার’, ‘টারজান’, ‘রবিনহুড’ ‘সিন্দবাদ’- এসব ডাবিং সিরিজের নাম শুনলেই হয়তো রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠেন পুরনো দর্শকরা। ডাবিং সিরিয়াল হলেও উৎকর্ষ মান ছিল সিরিজগুলোর। এছাড়া ‘মি. বিন’, রেসলিং যা কিছুই ডাবিং করে দেখানো হতো বাংলা সংস্কৃতি বিবর্জিত কোনও বিষয় ছিল না এগুলোতে। তারপরও রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে বিটিভি দর্শক ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল। তাদের চোখ নিজেদের পর্দায় ফেরাতে চেয়েছিল একুশে টেলিভিশন। এ কাজে অনেকটা সফল হয়েছিল বেসরকারি চ্যানেলটি। তবে বিদেশি সিরিয়ালের জন্য নয়, সংবাদ উপস্থাপনের নতুন আঙ্গিক ও মানসম্মত নাটক আর অনুষ্ঠানের জন্য মানুষ একুশে টিভি দেখতে শুরু করেছিল। এরকম একটি সফল দৃষ্টান্ত চোখের সামনে থাকার পরও কেন বিদেশি নির্মাতাদের সংস্কৃতি বিবর্জিত বিদেশি কাহিনি টেলিভিশনের পর্দার মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে ঘরে ঘরে?

জাতীয় চেতনাবোধ থেকে সব মানুষকে সচেতন করে তোলার দায়িত্ব টেলিভিশনের। দর্শকের রুচি ও প্রত্যাশার সঙ্গে মিল রেখেই কাজ করতে হয় চ্যানেলগুলোকে। বাংলাদেশের জনরুচি ধরতে পেরেছিল একুশে টেলিভিশন। তারপর একে একে সরকারি নিবন্ধন পেলো ৩৪টি বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল। জনরুচিকে উপক্ষা করেই অনেক চ্যানেলে এখন দেখানো হচ্ছে ডাবিং সিরিজ, যার বেশিরভাগই নিম্ন রুচির।

চ্যানেলগুলোর দাবি, ‘দর্শক চাহিদা আছে বলেই দেখানো হচ্ছে বিদেশি সিরিয়াল!’ এদেশের মানুষ তো একসময় উর্দু সিনেমাও দেখতে চাইতো। হিন্দি সিনেমাও দেখতে চায়, দেখেও। ভারতীয় বাংলা চ্যানেল তো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শহর, গ্রামে। সেগুলোও তো নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। অকারণে দেশীয় চ্যানেলগুলোকে বিজ্ঞাপনের প্রতিযোগিতার মুখে ফেলা হচ্ছে। বিদেশি সিরিয়াল দেখানোর পক্ষে চ্যানেল কর্তৃপক্ষের যুক্তি অনেক। যুক্তিগুলো যৌক্তিকও। তাহলে করণীয় কী? যুক্তি মেনে বসে থাকা? নাকি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আদর্শ ঐতিহ্যকে রক্ষা করা? উর্দু সিনেমা বা হিন্দি সিনেমা, ইংরেজি সিনেমাসহ বিদেশি সিনেমা প্রদর্শনের পেছনেও যুক্তি ছিল- দর্শক দেখতে চায়। স্বাধীনতার পরেও যেসব দর্শক উর্দু ভাষায় নির্মিত সিনেমা দেখার পক্ষে ছিলেন, তাদের রুচিবোধের প্রতি যদি সম্মান দেখিয়ে উর্দু সিনেমার প্রদর্শন চালু রাখা হতো, তাহলে আজ দেশের সংস্কৃতির চরিত্র কী হতো? স্বাধীনতার গল্প শুনতো কতজন দর্শক? দর্শক রুচিকে সম্মান দেওয়া জরুরি, সব দর্শক রুচিকেই কি সম্মান দেবো আমরা?

একসময় বাংলা সিনেমায় অশ্লীলতার পক্ষেও এমন যুক্তি ছিল। এখন দর্শক রুচিকে কোন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় সব সিনেমা হল এখন বন্ধ হওয়ার পথে। এ বছর সিনেমা হলের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে- ‘সিনেমা হলে তালা’ নামে একটি বই লিখেছেন সাংবাদিক মঈন আব্দুল্লাহ। পাঁচ-দশ বছর পর হয়তো অন্য একজন সাংবাদিক লিখবেন ‘টেলিভিশন বন্ধ’ নামের কোনও বই। কিন্তু আমরা কোনও টেলিভিশন চ্যানেলের মৃত্যু চাই না। এটিও চাই না টেলিভিশন ধ্বংস করুক আমাদের সংস্কৃতিকে। আমার ঘরে একটা টেলিভিশন আছে। কিন্তু তিন বছর ধরে ডিশ এন্টেনার লাইনটা খোলা। এমন করে না জানি কত ঘর আজ টেলিভিশন শূন্য।

বাংলাদেশের সব স্যাটেলাইট চ্যানেল তো দেশীয় সংস্কৃতি বিকাশের প্রতিশ্রুতি থেকে শুরু হয়। তাহলে কিছুদিন পরেই কেন এই রঙবদল। টাকা যিনি লগ্নি করেন, তিনি যা খুশি তাই করতে পারেন! একটি নতুন স্যাটেলাইট চ্যানেল শুরু করার জন্য ৬০-৭০ কোটি টাকার যন্ত্র আমদানি করে বিজ্ঞাপন দিয়ে বলা হয়— অত্যাধুনিক প্রযুক্তির টিভি চ্যানেল, এইচডি কোয়ালিটি! অথচ কোনও স্যাটেলাইট চ্যানেল প্রশিক্ষণ দিয়ে এক-দু’জন নির্মাতা তৈরি করেছে একথা বলতে পারবে না কেউ। টেলিভিশন ও সিনেমা নিয়ে বাংলাদেশে পড়াশোনা করার জন্য নতুন প্রতিষ্ঠিত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব টেলিভিশন ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি ও একটি-দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে টেলিভিশনের কাজ শেখার জন্য বাংলাদেশে তেমন কোনও জায়গা বা প্রতিষ্ঠান নেই।

যারা মা-বাবার অন্ন ধ্বংস করে, এখানে-ওখানে ঘোরে, ওস্তাদের সঙ্গে বিনা পয়সায় গাড়ির হেলপারের মতো কাজ শিখে দক্ষতা নিয়ে টেলিভিশনে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করে, সাধারণত তাদেরই নিয়োগ দেয় স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো। এখন শুরু হয়েছে নতুন একটি প্রবণতা— কর্মী ছাটাই। কারিগরি বিদ্যা না থাকলে স্যাটেলাইট চ্যানেলে চাকরি পাওয়ার সুযোগ নেই। প্রশিক্ষিত কর্মীদের নিয়োগ দিয়ে আট-দশ বছর পর স্যাটেলাইট চ্যানেলে কেন হঠাৎ ছাটাই জরুরি হয়ে পড়ে? কাজে তো অভিজ্ঞতা বাড়ে। আট-দশ বছর কাজ করার পর কি হঠাৎ মেধাহীন হয়ে পড়ে কোনও মানুষ, নাকি হঠাৎ দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রবণতা শুরু হয় মানুষের মধ্যে। বিষয়টি গণমাধ্যমের জন্য অবশ্যই একটি অশনিসংকেত।

বিশ্বজুড়েই কর্মী ছাটাই হচ্ছে। বাংলাদেশেও হয়। গার্মেন্টসেও কর্মী ছাটাই নীতিমালা আছে। শ্রম আইন আছে দেশে। অনেক প্রতিষ্ঠানে তা মানাও হয়। ব্যতিক্রম শুধু স্যাটেলাইট চ্যানেল। যখন যেমন খুশি, যাকে খুশি ছাটাই করা যায়। এতে শুধু একজন ব্যক্তিই বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে ভাবা ঠিক হবে না, বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে সংস্কৃতিও। এভাবে অভিজ্ঞ মেধাবী কর্মীরা একসময় টেলিভিশন বিমুখ হবে। এখনই হতে শুরু করেছে। মধ্য বয়সে এসে একজন কর্মীর জীবন বিপর্যয়ের মধ্যে নিপতিত হওয়ার ঘটনা শুধু তার জন্য ক্ষতিকর নয়, ক্ষতি হচ্ছে টেলিভিশনেরও। নতুন প্রজন্মও টেলিভিশনের প্রতি আগ্রহ হারাবে। চ্যানেলের ব্যবসা হচ্ছে না বলে কর্মী ছাটাই, অতিরিক্ত জনবল নিয়ে শুরু হয়েছিল বলে কর্মী ছাটাই— এমন যত যুক্তিই দাঁড় করানো হোক, এর মূল কারণ বিদেশি সিরিজ বা সিরিয়াল। কর্মীদের চাকরি বাঁচানোর জন্য বিদেশি সিরিজ বন্ধ করা জরুরি। তবে এমন নয় যে, আমাদের প্রশিক্ষিত কলাকুশলীদের গণমাধ্যমে ধরে রাখা ও নতুন প্রজন্মকে গণমাধ্যমের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের দেশে বিদেশি সিরিয়াল আমদানি হচ্ছে। এ কারণে জলের মতো তার বেয়ে বিদেশি সংস্কৃতি ঢুকে পড়ছে ঘরের ভেতরে। বলা হচ্ছে বিশ্বায়ন ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির কথা। অবাধ তথ্যপ্রবাহের কথা। সত্য-অসত্য যেকোনও তথ্যই তো বাতাসের মতো ঢুকছে ঘরের ভেতর। টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমে বিদেশি সংস্কৃতি ঢুকলে ক্ষতি কী? কোনও ক্ষতি নেই। বাংলা ভাষার পেটেও তো ঢুকেছে অনেক বিদেশি শব্দ। বাংলা ভাষা তো হজমও করেছে এসব শব্দকে। এখন কোনটা বাংলা আর কোনটা উর্দু বা ফার্সি তা আলাদা করার জন্য অভিধান ঘাঁটতে হয়। একথা বলা এখন আমাদের গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে— বাংলা ভাষা এমন একটি ভাষা যা অকপটে অন্য ভাষা গ্রহণ করে। একসময় হয়তো এমনও বলা হবে বাংলা সংস্কৃতি এমন এক সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতি অকপটে গ্রহণ করতে পারে অন্য সংস্কৃতির সবকিছু। কোনটা বাংলা সংস্কৃতি আর কোনটা আরবি, উর্দু, ফার্সি বা অন্য সংস্কৃতি থেকে ঢুকে পড়েছে আমাদের নতুন প্রজন্মের মগজে; একদিন হয়তো তা আলাদা করা কষ্টকর হয়ে যাবে।

বহু আলোচনা-সমালোচনার পরেও দলীয় প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি বিটিভি। তারপরও সরকারি চ্যানেলটির অনুষ্ঠান এখন আগের চেয়ে একটু ভালো ও মানসম্মত। অন্তত বেসরকারি টেলিভিশনের তুলনায়। বিটিভি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দর্শকদের কাছে দায়বদ্ধ ভালো-মন্দ বা সত্য-অসত্য তথ্য পরিবেশনের বিষয়ে। বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক। তারা নিজস্ব উপার্জিত অর্থে চলে, তাই তারা এতটা দায়বদ্ধ নয় মানুষের কাছে। একথা ঠিক। তবে এটিও কি মানতে হবে যে, নীতিমালা ছাড়া তারা যা খুশি তাই দেখাতে পারবেন? সরকারের কাছেও কি তারা দায়বদ্ধ না? দেশে এখন এত বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল, ভালো মানের অনুষ্ঠান নির্মাণ নিয়ে তো প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা ছিল। হলো কী? হচ্ছে কী? দর্শক পছন্দের চ্যানেল খুঁজে পাচ্ছে না। তাই এখন তারা খুঁজে নিচ্ছে বিনোদনের বিকল্প পদ্ধতি। নতুন প্রজন্ম তো নিজেরাই অনুষ্ঠান নির্মাণ করছে, গান গাইছে, নাটক বানাচ্ছে, প্রচার করছে ইউটিউবে, দর্শক দেখছেও এসব চ্যানেল।

টেলিভিশন কারা দেখে? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য জরিপ করার দরকার পড়ে না। দেখে প্রায় প্রত্যেকেই। বড়রা যেমন দেখে, দেখে ছোটরাও। বড়দের চেয়ে ছোটরা দেখে বেশি, পুরুষদের চেয়ে নারীরা দেখে বেশি। কারণ তারা দেখার জন্য একটু বেশি সময় পায়। বড়রা দেখে অফিস শেষে বাসায় ফেরার পর, রাতে বা সন্ধ্যায়। ছোটরা দেখে বিকালে বা সন্ধ্যায়। নারী ও শিশু দর্শকদের কথা বিবেচনায় রেখে বিদেশি কার্টুন ও সিরিজ নির্বাচন করে চ্যানেলগুলো। তাই নারী ও শিশুদের উপযোগী বিদেশি সিরিজ বেশি দেখানো হচ্ছে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে। এটি আমাদের ভবিষ্যৎ শিশুদের সুস্থ সংস্কৃতির জন্য অবশ্যই হুমকির কারণ।

যুক্তি দিয়ে যদি চাকু, ছুরি বা ব্লেড দিয়ে ছোটদের খেলা বৈধ করা হতো তাহলে ডাবিং সিরিজ বা ডাবিং কার্টুন নিয়ে কিছু বলা অযৌক্তিক হতো। যেহেতু বলা হয় ছোটরা পছন্দ করলেই সব খেলনার উপকরণ তাদের হাতে দেওয়া যাবে না, একই কারণে এমন উদ্ভট অঙ্গভঙ্গির কার্টুন সিরিজ বা ধারাবাহিক অনুষ্ঠান টেলিভিশনে দেখানো বন্ধ করা উচিত। 

যাদের বয়স ২৫ বছরের নিচে তাদের মাধ্যমেই অপরাধ ঘটে বেশি। এটি গবেষণার তথ্য। এর কারণ কী? নিজস্ব বিচার-বিশ্লেষণে কাজ করার ক্ষমতা তাদের কম থাকে। অন্যের আদর্শ বা অন্যের মতবাদে এই বয়সের ছেলেমেয়েরা বেশি প্রভাবিত হয়। তারা টেলিভিশন দেখার সময় পায় বেশি, দেখেও বেশি। ‘নেশন’ পত্রিকার তথ্য মতে, ১৯৫৮ সালে আমেরিকায় যখন টেলিভিশনের সংখ্যা ৫ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তখন দেশে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এসবের পেছনের কারণ ছিল নৈরাশ্য। অপরাধ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ ‍ওলিন তখন মন্তব্য করেছিলেন, ‘টেলিভিশনই হচ্ছে সর্বাপেক্ষা ব্যাপক ভিত্তিক সরাসরি প্রভাবিত করার মাধ্যম ও নৈরাশ্য মনোভাবের প্রধান কেন্দ্র।’

অপসংস্কৃতির স্রোতে খড়কুটোর মতো বেঁচে আছে আমাদের মঞ্চনাটক, হিন্দি গানের দমকা হাওয়ায় উড়ছে বাংলা গান, বিলীন হচ্ছে সুরেলা কণ্ঠ, ভারতীয় সিনেমা গিলে খেলো বাংলাদেশের বাংলা সিনেমাকে। বাংলা নাটক তো এখন বিশেষ দিবসের বিনোদন মাত্র। তার ধাক্কায় শুরু হয়েছে চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান নির্মাতা, কলাকুশলী ও কর্মীদের ছাটাই মাতম। বেতন বাড়ে না, বেতন ঠিকমতো দেওয়া হয় না; এসব অভিযোগ তো পুরনো। উজ্জ্বল তারার মতো কলাকুশলীদের খসে পড়ার ধারা অব্যাহত থাকলে অচিরেই টেলিভিশনের মৃত্যু হবে।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বাংলাদেশের অনেক শিল্পী, অভিনেতা, অভিনেত্রী, কলাকুশলী ছিলেন ভারতে। মুস্তাফা মনোয়ার, সৈয়দ হাসান ইমাম, সুচন্দা, ববিতা, কবরী, সুভাষ দত্তসহ আরও যারা ছিলেন ভারতে, তারা দেশে ফেরার পর বাংলা সংস্কৃতিকে, বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ডাক দিয়েছিলেন। বিশ্বায়নের যুগে ‘বাংলা সংস্কৃতি’, ‘বাংলা সংস্কৃতি’ বলে চিৎকার করা কতটা যৌক্তিক, এ প্রশ্ন আসতেই পারে। তখন কি বিশ্বায়ন ছিল না? আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি, বাঙালি চেতনার কথা বলি, এই চেতনাবোধের আড়ালে আমরা কী করছি? কী করছে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো? তা এখনই বিবেচনায় না নিলে টেলিভিশন টিকবে না, টিকতে পারবে না। টেলিভিশনের প্রতি মানুষের অরুচি ধরবেই।

লেখক: গবেষক, তথ্যচিত্র নির্মাতা