রাবির ইতিহাসে অংশীদার হচ্ছে ভিসির ‘অঙ্গীকার’ পূরণের সমাবর্তন

হাসান আদিব

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৮:১২ পিএম, ২৯ নভেম্বর ২০১৯ শুক্রবার | আপডেট: ১০:২০ এএম, ৩০ নভেম্বর ২০১৯ শনিবার

১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৬ সালে। চার বছর পর ১৯৬০ সালে হয় দ্বিতীয় সমাবর্তন। অধ্যাদেশের নিয়ম মেনে ১৯৬১ ও ১৯৬২ সালে হয় তৃতীয় ও চতুর্থ সমাবর্তন।

এরপর অনিয়মিত হয়ে পড়ে সমাবর্তন উৎসব। তিন বছর পর ১৯৬৫ সালে পঞ্চম এবং ১৯৭০ সালে ষষ্ঠ সমাবর্তন পান গ্রাজুয়েটরা। এর দীর্ঘ ২৮ বছর পর ১৯৯৮ সালে সপ্তম সমাবর্তন করেন উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল খালেকের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। এরপর ফের অপেক্ষা।

অষ্টম সমাবর্তন পেতে গ্রাজুয়েটদের ১৪ বছরের সেই অপেক্ষা শেষ হয় ২০১২ সালে। উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রথম মেয়াদে সফলভাবে সমাবর্তন আয়োজন করেন ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান। পরের বছরের শুরুতে তার মেয়াদ শেষে দায়িত্ব পান সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন। দায়িত্ব গ্রহণের দুই বছর পর ২০১৫ সালে নবম সমাবর্তনের আয়োজন করে অধ্যাপক মিজানউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। পরবর্তীতে দশম সমাবর্তনের আয়োজনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি।

২০১৭ সালের শুরুর দিকে তার মেয়াদ শেষ হলে দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্যের দায়িত্ব পান অধ্যাপক আব্দুস সোবহান। দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০১৮ সালে দশম সমাবর্তন সফলভাবে আয়োজন করে তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। তবে অনিয়মিত সমাবর্তন আয়োজন নিয়ে তৎকালীন সময়ের গ্রাজুয়েটসহ বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মাঝে হতাশা-ক্ষোভের অন্ত ছিল না। এ নিয়ে অভিযোগ-অনুযোগ যায় উপাচার্যের কাছেও।

দশম সমাবর্তন পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলন ও সমাবর্তন মঞ্চে বক্তৃতায় উপাচার্য অঙ্গীকার করে ঘোষণা দেন, ‘এখন থেকে প্রতিবছর সমাবর্তন আয়োজন করা হবে।’ ২০১৮ সালে দশম সমাবর্তনের ঠিক একবছর পরই একাদশ সমাবর্তন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহান সেই অঙ্গীকার পূরণ করতে চলেছেন আগামী শনিবার (৩০ নভেম্বর)।

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ কামাল স্টেডিয়ামে সমাবর্তনের সব প্রস্তুতি শেষ। শনিবার বিকেল ৩টায় শুরু হবে মূল অনুষ্ঠান। এই সমাবর্তন ইতিহাসের অংশও বটে! ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত পরপর তিন বছর সমাবর্তন অনুষ্ঠানের পর দ্বিতীয়বারের মতো পরপর দুই বছর সমাবর্তন করতে যাচ্ছে রাবি প্রশাসন। যা আবার স্বাধীন বাংলাদেশে রাবির ইতিহাসে এই প্রথম। একই সঙ্গে রাবির উপাচার্য হিসেবে রেকর্ড তিনটি সমাবর্তন করতে যাচ্ছেন অধ্যাপক সোবহান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপকরা বলছেন, এটি সম্ভব হয়েছে উপাচার্য আব্দুস সোবহানের দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বের কারণে। বিভিন্ন সময়ে সমাবর্তন শিক্ষকদের একটি পক্ষ বর্জনের ঘোষণা করলেও এবার তা ঘটেনি। বড় কোনো ব্যত্যয় না ঘটলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অংশীদার হয়ে থাকবে একাদশ সমাবর্তন।

সমাবর্তনে অংশ নিতে ঢাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসা নিবন্ধিত গ্রাজুয়েট নাট্যকলা বিভাগের হৃদয় আল মিরু বলেন, আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন দীর্ঘদিন পর সমাবর্তন হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঠাট্টা করতেও ছাড়তো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সমাবর্তন হলেও আমরা তা পেতাম না। এবার নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজন করায় প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই।

তার মতোই খুশি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের গ্রাজুয়েট রিপন রাসেল। তিনি আমার নিউজ রাজশাহীকে বলেন, আমি ভাবতেই পারিনি, এত অল্প সময়ের ব্যবধানে রাবি প্রশাসন আরেকটা সমাবর্তন আয়োজন করবে। আমার ব্যাচমেট অনেকে নিবন্ধন করেনি। তারা ভেবেছিল হয়তো নিবন্ধন করিয়ে রাখলেও সমাবর্তন হবে না। পরে আবার নিবন্ধনের সুযোগ দেয়া হবে। তবে সমাবর্তন হয়ে যাচ্ছে দেখছি!

বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক রহমান রাজু বলেন, প্রতিবছর সমাবর্তন উৎসব পাওয়াটা গ্রাজুয়েটদের প্রাপ্য। সেটা না করতে পারাটা ব্যর্থতা। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় মাঝেমধ্যে অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে। তার মানে এই নয় যে, দেড়-দুই যুগ ধরে সেটা করা হবে না। বর্তমান প্রশাসন সমাবর্তন নিয়মিত করতে পারছে, এটা প্রশাসনের সফলতা তো বটেই, পাশাপাশি এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করবে। সমাবর্তনের সকল গ্রাজুয়েটকে অমি অভিনন্দন জানাই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের প্রশাসক অধ্যাপক প্রভাষ কুমার কর্মকার বলেন, দশম সমাবর্তনের পরপরই উপাচার্য মহোদয় একাদশ সমাবর্তন আয়োজনে বদ্ধপরিকর ছিলেন। উপাচার্যের দিক-নির্দেশনায় নানা সীমাবদ্ধতা সত্বেও দ্রুত আরও একটি সমাবর্তন আয়োজন করতে পেরে প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই বেশ খুশি। আশা করি- একাদশ সমাবর্তন সকলের সহযোগিতায় সাফল্যের সাথে সমাপ্ত হবে।

জানতে চাইলে রাবি উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহান নিউজ রাজশাহীকে বলেন, অধ্যাদেশ অনুসারে প্রতিবছর সমাবর্তন আয়োজনের রীতি রয়েছে। যখনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করা শিক্ষকরা প্রশাসনের নেতৃত্বে এসেছেন, তখনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন হয়েছে। বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী শিক্ষকরা প্রশাসনে এসে কখনও সমাবর্তন করতে পারেননি। এটি তাদের সংকীর্ণতা। ফলে সমাবর্তন অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।

উপাচার্য বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারে থাকা অবস্থায় সবক’টি সমাবর্তন করেছে রাবি। কারণ, প্রশাসনের সদিচ্ছার পাশাপাশি রাজধানীর বাইরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন আয়োজনের জন্য প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন হয়। সেটা সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে আমাদের পক্ষে পরপর দুই বছর সমাবর্তন আয়োজন সম্ভব হয়েছে। আশা করি, এ ধারা অব্যাহত থাকবে।