শেখ হাসিনার রচনাসমগ্র : একটি অন্তরঙ্গ পর্যালোচনা

নিউজ রাজশাহী ডেস্ক

নিউজ রাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৬:৪৩ পিএম, ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ শুক্রবার

আদিম থেকে পৃথিবী এখন সভ্যতায়। এই সভ্যতার বয়স কতো? সভ্য পৃথিবীর বয়স নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ বলেন পাঁচ হাজার বছর। কেউ বলেন আড়াই হাজার বছর। কেউ কেউ বলেন- আরে না, পৃথিবীর বয়স এক কোটি বছর। যে যেভাবে পারেন, বলেন। হয়তো নিজের মতো করে প্রমাণও আছে বয়স নিরুপণের, সভ্যতার। পৃথিবীর বয়স যতোই হোক, পৃথিবী যে সভ্য হয়ে উঠেছে, মানুষের জন্য বাসের উপযোগী হয়েছে, মূলে রয়েছে রাজনীতি।

আজকে দুনিয়া জুড়ে যে রাজনীতি, নিশ্চয়ই সহস্র সহস্র বছর আগের রাজনীতি এমন ছিল না। সেই রাজনীতির পার্ট ও প্যাটার্ন নিশ্চয়ই অন্যরকম বা আজকের চেয়ে ভিন্নরকম ছিল। ইতিহাস ঘেটে ঘেটে ঐতিহাসিকেরা হয়তো সেই রাজনীতির নানা পর্ব পাঠকদের সামনে ছেকে আনেন। রাজনীতি— মানে রাজার নীতি। আজকের যুগে বা কালে গণতন্ত্র নামে যে পাতে চুবানো পাউরুটি দুনিয়ার হাটে বাজারে বিক্রি হচ্ছে, নিশ্চয়ই আদিকালের রাজনীতি তেমন ছিল না। কিন্তু শত সহস্র বছর পার হয়ে এখন রাজনীতি, রাজা-বাদশাদের রাজদার বা অন্দরমহল থেকে চলে এসেছে রাস্তায়। আমার মাঝে মাঝে রাস্তার নীতি থেকে রাজনীতি শব্দটির বিকাশ বা উদ্ভব মনে হয়। 

তো গণতন্ত্র এখন রাজনীতির প্রধান অস্ত্র দুনিয়া জুড়ে। সেই দেশ বা জাতি ততটা সভ্য, যে জাতি যতোটা গণতন্ত্র লালন ও পালন করে। আজকের স্বাধীন ও স্বার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম, বিকাশ এবং অগ্রসরের মূলে, সেই রাজনীতি। রাজনীতির মূল লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ। মানুষের কল্যাণ। দেশ ও সমাজের উন্নতি। সেই রাজনীতি যারা করেন, তারা রাজনীতিবিদ। রাজনীতির নানা কূটচালের ভেতর দিয়ে, প্রতিপক্ষের আঘাতকে প্রতিহত করে প্রত্যাঘাত করে জিতে আসাও রাজনীতির পাঠ। 

সেই পাঠ নিয়ে ১৯৭১ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে নতুন একটি জাতিস্বর জেগে ওঠে এই বাংলায়, গোপালগঞ্জের বাইগার নদীর তীর থেকে আসা এক মুকুটহীন রাজানীতিবিদ রাজজননায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। তাঁর সেই অবিসংবাদিত নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন গাজীপুরের তাজউদ্দিন আহমেদ, কিশোরগঞ্জের সৈয়দ নজরুল ইসলাম, রাজশাহীর এ এইচ এম কামরুজ্জামান, পাবনা সিরাজগঞ্জের এম মনসুর আলী সহ অজস্র নেতাকর্মী আর বাংলার সাড়ে সাতকোটি বাঙালি। সাড়ে সাতকোটি বাঙালি মহামানবের তীরে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব যেদিন উচ্চারণ করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগাম, এবারের সংগাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ মূলত বাংলাদেশতো সেদিনই স্বাধীন। 

রাজনীতিবিদদের রুচি, পড়াশোনা, সাংস্কৃতিক মানদণ্ডের মধ্য দিয়ে একটি দেশ বা রাষ্ট্র এগিয়ে চলে, সামনের দিকে। বেদনার সঙ্গে লিখতে হচ্ছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদই অসংস্কৃতবান। হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে বা কলেজে পড়াশোনা করে রাজনীতিতে এসেছেন কিন্তু মনন, প্রজ্ঞা, চিন্তার প্রবহমানতা খুবই অগভীর। ফলে, সমাজ বা রাষ্ট্রে দেখা দেয়, সংস্কৃতির সংকট। প্রকটভাবে প্রবল হয়ে ওঠে রুচির দুর্ভিক্ষ। 

দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি দিতে পারে, পড়া আর লেখা। কিন্ত আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে যতোটা পেশীর দাপট দেখা যায়, পড়ালেখার প্রকাশ ততটা নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে যখন কোনো রাজনীতিবিদ লেখেন, লেখায় প্রকাশ করেন দর্শন, সমাজ ও দেশ ভাবনা, তখন উৎফুল্ল না হয়ে পারা যায় না। আমাদের দেশে হাতেগোনা কয়েকজন রাজনীতিবিদ রাজনীতির সঙ্গে মননেরও চর্চা করেছেন। তার মধ্যে আবুল হাশেম, আবুল মনসুর আহমদ, খোন্দকার মোহাম্মাদ ইলিয়াস, অলি আহাদ, বদরুদ্দিন উমর অন্যতম। 

হালের বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নতুন এক দিগন্ত নিয়ে এসেছে বাঙালির মানস দরবারে। শেখ মুজিবুর রহমানের এই রচনার মধ্য দিয়ে চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকের এই অঞ্চলের রাজনীতির একটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। তিনি পাকিস্তানের জেলখানায় বসে যদিও এই আত্মজীবনী লিখেছেন, কিন্তু ভাষার প্রাঞ্জলতা, বাস্তব স্মৃতির অনুপুঙ্খ বর্ণনার মধ্য দিয়ে বইটি বাংলাদেশে বেস্ট সেলারের মর্যাদা পেয়েছে ইতিমধ্যে। 

শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা। ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়ির প্রতিটি কক্ষ থেকে তিনি দেখেছেন পিতার রাজনীতি, যে রাজনীতি দেশের জন্য, মানুষের জন্য এবং বাঙালির জন্য। পিতার পথ ধরে তিনিও লিখছেন। লেখা একজন মানুষের চির অস্তিত্বের মর্মমূল থেকে উঠে আসে। ফলে, লেখা হয়ে যায় নিজের দর্পণ, সমাজের দায়। শেখ হাসিনা অনেকগুলো পুস্তক রচনা করেছেন। সব কটা পুস্তক নিয়ে মওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে রচনাসমগ্র- এক ও রচনাসমগ্র- দুই। দুটি খণ্ড প্রথম প্রকাশ হয়েছিল ২০১০ সালে। ইতিমধ্যে বই দুটির চতুর্থ মুদ্রণ চলছে। এতে প্রমাণ হচ্ছে যে, লেখক শেখ হাসিনা বিপুল পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। 

রচনাসমগ্রের মুখবন্ধে বিশিষ্ট লোক গবেষক, ফোকলোরাচার্য শামসুজ্জামান খান লিখেছেন- ‘শেখ হাসিনা তাঁর মহান পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম ও অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্ট বাংলাদেশের চার রাষ্ট্রনীতিভিত্তিক মৌলিক সত্তা রক্ষার যেমন অঙ্গিকারদীপ্ত নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন তেমনই লেখালেখির মাধ্যমে তাঁর চিন্তা-চেতনা ও রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়ে চলেছেন।  

আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের বই-পুস্তক পড়া বা লেখালেখির অভ্যাস নেই বললেই চলে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেক্ষেত্রে আশ্চর্য ব্যতিক্রম। পিতার সেই দুর্লভ গুণ শেখ হাসিনাও যে নিপুণ দক্ষতায় অর্জন করেছেন বর্তমান রচনাসমগ্রই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। শেখ হাসিনা বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী হওয়ায় তাঁর গদ্যের বিন্যাসে কিছু পরিশীলনেরও ছাপ আছে। সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশে এই প্রথম একজন খুব বিপুল জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতার রচনাসমগ্র প্রকাশিত হলো। এ ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃৎ হয়ে থাকার গৌরব অর্জন করলেন। ’

উপরে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক শামসুজ্জাসান খান যা লিখেছেন, সার কথাই লিখেছেন। কেননা, স্বাধীনতা উত্তর স্বাধীন বাংলাদেশে খুব কম রাজনৈতিক নেতা রাজনীতির পাশাপাশি নিজস্ব অনুভাবনা লেখায় ব্যক্ত বা প্রকাশ করেছেন। ব্যতিক্রম জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি অনেকগুলো কেন্দ্রের মধ্যমণি হয়ে জন্ম থেকে বেড়ে উঠেছেন। প্রথমত তিনি জন্মেছেন এমন একটি রাজনৈতিক পারিবারে, সেখানে চোখ বুঝে থাকলেও রাজনীতি তাকে ঘুমুতে দেয়নি। ঘুমের মধ্যেও রজনীতির উদাত্ত গান তিনি শুনেছেন, শুনতে বাধ্য হয়েছেন। দ্বিতীয়ত তিনি বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী থাকার কারণে সাহিত্যের রস তাঁর অস্তিত্বের মর্মজুড়ে বিরাজ করছে, চেতনে বা অবচেতনে। তৃতীয়ত মানুষের প্রতি, গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর অসীম দরদ বা মমতা। এইসব মিলে তাঁর চেতনা প্রবাহের মধ্যে লেখা সব সময়ে জাগরুক ছিল। এবং তিনি শত ব্যস্ততার মধ্যেও এই লেখাগুলো লিখেছেন। দুই খণ্ডে মিলিয়ে প্রায় সাতশ’ পৃষ্ঠা লেখা কম কথা নয়। 

কী লিখেছেন তিনি? এই প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে আমাদের মেনে নিতে হবে যে, তিনি গল্প-উপন্যাস রচনা করেননি। তিনি মানুষের, এই দেশের ভুখা নাঙ্গা দরিদ্র পীড়িত মানুষের মানচিত্র আঁকতে চেয়েছেন নিজস্ব চেতনার রঙে অনুভবের মহত্তম কালিতে। সুতরাং শেখ হাসিনার লেখা রাজনীতি, বাংলার মানুষ, তাদের দুঃখ-বেদনার আর্তি ও আর্তনাদ, গণতন্ত্রের জন্য অসীম লড়াই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে তার নিরলস শ্রম ও মেধার প্রয়োগ, ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করেন- এমন কয়েকজন পরম মানুষের প্রতি নিজস্ব শ্রদ্ধা আলেখ্যও নির্মাণ করেছেন এইসব ধ্রুপদী লেখায়। 

প্রথম খণ্ডে শেখ হাসিনার পাঁচটি বইয়ের লেখা মুদ্রিত হয়েছে। বইগুলোর নাম যথাক্রমে- ওরা টোকাই কেন, বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম, দারিদ্র দূরীকরণ : কিছু চিন্তাভাবনা, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন এবং বিপন্ন গণতন্ত্র লাঞ্ছিত মানবতা। ১৯৮৯ সালে শেখ হাসিনার প্রথম বই ‘ওরা টোকাই কেন’ বইয়ের ভূমিকায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন- ‘ছ’টি প্রবন্ধ নিয়ে এ বই। এসব প্রবন্ধে ব্যক্তিগত কথা আছে, পারিবারিক কথা আছে, দেশের কথা আছে, দশের কথা আছে, রাজনীতির কথা আছে, সমাজের কথা আছে। নিজের চারপাশটা যেমন দেখেছেন লেখিকা, তেমন তা ফুটিয়ে তুলেছেন। যাকে বলা যায় ছক-কাটা রচনা, এই বইয়ের প্রবন্ধগুলো তা নয়। এগুলো হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ত লেখা- তাই এক প্রসঙ্গ থেকে তিনি অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছেন অনায়াসে। এক মানুষের কথা বলতে বলতে অন্য মানুষ বা একাধিক মানুষের কথা বলেছেন।’ 

‘একাধিক মানুষের কথা বলেছেন’ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যথার্থই লিখেছেন। তিনি, এই বইয়ের বা রচনাসমগ্রের লেখক জননেত্রী। ‘জন’ মানে মানুষ, ‘গণ’ মানুষ। এই জনগণ নিয়ে ক্ষুদিরাম, তিতুমীর, সূর্যসেন, হাজী শরীয়তুল্লাহ, শহীদ আসাদ, জীবনানন্দ দাশ, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ, সাড়ে সাতকোটি বাঙালি আর বঙ্গবন্ধুর চির আরদ্ধ আবহমানকালের বাংলা। এই বাংলার ক্ষুধা দারিদ্র পীড়িত জনগণের তিনি নেত্রী বা নেতা। তিনিতো জনগণের কথাই বলবেন, তিনিতো সেই চিরকালের বুভুক্ষ মানুষের পক্ষেই লিখবেন। তিনি না লিখলে, তিনি না ভাবলে, কে লিখবে, কে ভাববে?

জননেত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে গ্রামবাংলার লৌকিক রূপ রস আর ছন্দের বিভাস চিরকালের স্রোতের মতো বহমান, প্রমাণ রেখেছেন তিনি ‘ওরা টোকাই কেন’ বইয়ের প্রথম প্রবন্ধ ‘স্মৃতির দক্ষিণ দুয়ার’ এর শুরুতেই। তিনি লিখেছেন- ‘গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া গ্রামখানি এক সময়ে মধুমতি নদীর তীরে ছিল। বর্তমানে মধুমতি বেশ দূরে সরে গেছে। তারই শাখা হিসেবে পরিচিত বাইগার নদী এখন টুঙ্গীপাড়া গ্রামের পাশ দিয়ে কুল কুল ছন্দে ঢেউ তুলে বয়ে চলেছে। রোদ ছড়ালে বা জ্যোৎস্না ঝরলে সে নদীর পানি রুপোর মতো ঝিকমিক করে।’

কী অনবদ্য শুরু! না হয়ে উপায় নেই। তিনিতো ওই মাটি, জল, হাওয়া ও উদার আকাশের নীড় থেকে উঠে এসেছেন। বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার রৌদ্র, বাংলার আকাশ-চিরকাল আমাদের। বাঙালির। তিনিতো সেই বাঙালি চেতনার শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি, বাঙালি জাতির জনকের অধিষ্ঠানে। সুতরাং উত্তারিকারের উষ্ণরেখায় জননীর লেখায় বাংলার চিরকালের রূপ রস সৌন্দর্য উদ্ভাসিত হবে, স্বাভাবিকভাবেই। ‘স্মৃতির দক্ষিণ দুয়ার’ প্রবন্ধে শেখ হাসিনা তাঁর চিরাচেনা গ্রাম, গ্রামের মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা, প্রকৃতি, শৈশব, পিতার আদর, ভৌগলিক বিবরণ নিবিড় দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। আর এই লেখাটি পাঠ করলে গোটা বাংলাকে, আটষট্টি হাজার গ্রামকে অনুভব করা যায়। একটি গ্রাম মানে বাংলার সকল গ্রাম জলে স্থলে আবহাওয়ায় গাছপালায় নদী ও নারীতে একীভূত। 

গ্রামের উন্নয়নকে শেখ হাসিনা কীভাবে অনুভব করেন, তার চিত্র এঁকেছেন মমতার সঙ্গে এই প্রবন্ধে। তিনি লিখেছেন- ‘গ্রামের উন্নয়ন প্রক্রিয়া বলতে আমি কোনো ছিটেফোঁটা বা সাময়িক ব্যবস্থায় বিশ্বাসী নই। যুগ যুগ ধরে অন্ধকারে পড়ে থাকা পশ্চাৎপদ জীবনযাত্রার অভ্যস্ত প্রাচীন কৃষি-ব্যবস্থার প্রচলিত ধ্যান-ধারণার সামগ্রিক সংস্কার করে আধুনিক গ্রাম গড়ে তুলতে হবে। আমি কোনো অনুদানমূলক বা প্রতিশ্রুতপূর্ণ উন্নয়ন নয়, ‘টোটাল’ বা ‘সামগ্রিক’ উন্নয়ন চাই। এজন্য প্রয়োজনবোধে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং শিক্ষিত সচেতন তরুণ সমাজকে কাজে নামাতে হবে।’

শেখ হাসিনা অনুভব করেছেন গ্রাম বাংলাদেশের প্রাণ। তাই তিনি গ্রামের সার্বিক উন্নয়ন চান। কেমন হবে সেই উন্নয়ন? সেই উন্নয়ন অনুদানে ভরপুর নয়, মিছিল মিটিং-স্লোগানের উন্নয়ন নয়, সেই উন্নয়ন হবে টেকসই। সেই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে তরুণেরা। তিনি জানেন, পৃথিবীতে যখন কোনো পরিবর্তন এসেছে, সেই পরিবর্তন এসেছে তরুণদের হাত ধরে। তরুণরা নির্বিক, নির্লোভ। যার প্রমাণ, তরুণেরা রেখেছে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি আগ্রাসী হায়েনা বাহিনীর রক্তাক্ত হাত থেকে বাংলাকে স্বাধীন করেছে। রক্ষা করেছে। তরুণদের সেই অমিত শক্তির উপর নির্ভর করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চান তিনি। 

এখানে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু একটি ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমি ভিক্ষুকের নেতা হতে চাই না’। জনকের সেই অমৃত বাণীকে মনে রেখে শেখ হাসিনা নতুন এক জাগ্রত ক্ষুধা দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেছেন লেখায়। ‘বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সেনাবাহিনী’ লেখাটি ইতিহাসের আলোকে ভিন্নমাত্রায় বিশ্লেষণের দাবি রাখে। আমরা জানি, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ এবং তাঁর তৈরী সেনাবাহিনী নিয়ে এদেশে বিচিত্র গল্প, সত্য মিথ্যা, মিথ্যাসত্য, অর্ধসত্য, অনেক অনেক রটনা রটেছে। প্রতিপক্ষ সেইসব রটনা রসিয়ে রসিয়ে মানুষের কাছে বলেছে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকালের অন্যতম সাক্ষী। তিনি দেখেছেন, শুনেছেন পিতা শেখ মুজিবুর রহমান কীভাবে বিধ্বস্ত বাংলার সেনাবাহিনী গড়ে তুলছেন। সেনাবাহিনী একটি স্বাধীন জাতির গৌরব। পাকিস্তানের সময়ে বাঙালিরা মেজরের উপরে যেতে পারেনি। পারেনি, মানে যেতে দেয়নি পাশ্চিম পাকিস্তানের স্বৈরশাসকেরা। ওরা বাঙালিদের কোনোভাবে বিশ্বাস করতো না। যার অকাট্য প্রমাণ, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

আজ বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র। পৃথিবীর অনেক যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে বাঙালি সেনাবাহিনী রাখছে অসাধারণ অবদান। কুড়িয়ে আসছে প্রশংসা। আর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। নৌ বিমান আর স্থল বাহিনী নিয়ে আমরা একটি শ্রেষ্ঠ সামরিক বাহিনীর মালিক। সেই বাহিনী তৈরী করতে বঙ্গবন্ধুকে কম পরিশ্রম করতে হয়নি। বিশাল তাঁর কর্মকাণ্ডের বিবরণ দিয়েছেন শেখ হাসিনা তাঁর লেখা ‘বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সেনাবহিনী’ প্রবন্ধে।
 
তিনি এক জায়গায় লিখেছেন- ‘দেশ তখন দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি। বঙ্গবন্ধু হাঁপিয়ে উঠেছেন দশ কোটি মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে। বাংলাদেশকে নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও তখন তুঙ্গে। সে সঙ্কটের সময়েও বঙ্গবন্ধু ভুলে যাননি তাঁর প্রিয় সেনাবাহিনীর কথা। খাদ্য ক্রয়ের পাশাপাশি বিদেশ থেকে সেনাবাহিনীর জন্য সংগ্রহ করেছেন প্রয়োজনীয় অস্ত্রসম্ভার। যুগোশ্লাভিয়ায় সামরিক প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে পদাতিক বাহিনীর জন্য আনা হয় ক্ষুদ্র অস্ত্রশস্ত্র এবং সাঁজোয়া বাহিনীর জন্য ভারী অস্ত্র। ভারতের অনুদান ত্রিশ কোটি টাকায় সেনাবাহিনীর জন্য কেনা হয় কাপড় ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে মিগ-২১ই, যা ছিল এ উপমহাদেশের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধ বিমান। আজ পর্যন্ত তার সমকক্ষ কোনো জঙ্গী বিমান আওয়ামী লীগ সরকারসমূহের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত উদ্যোগের ফলেই মিসর থেকে আনা সম্ভব হযেছে সাঁজোয়া গাড়ি বা ট্যাংক।’

তথ্যপূর্ণ এই লেখা থেকে বোঝা যাচ্ছে, বঙ্গবন্ধু কতো গভীরভাবে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে ভালোবাসতেন। কেননা, তিনিতো স্বাধীন বাংলাদেশের জনক। তিনি জানতেন, স্বাধীন দেশের স্বাধীনতা রক্ষাকবচ শক্তিশালী সেনাবাহিনী। মজার ঘটনা হচ্ছে, পরবর্তীকালে নানা চড়াই উৎরাই পার হয়ে ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব পেলে, শেখ হাসিনাই বাংলাদেশর সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের ব্যাপক পরিকল্পনা করেন এবং বাস্তবায়িত করেন। নৌবাহিনীকে ত্রিমাত্রিক একটি চৌকস বাহিনীতে পরিণত করেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর পথ ধরে রাশিয়া থেকে এনেছেন যুদ্ধ বিমান মিগ ২১। এনেছেন যুদ্ধ জাহাজ। পরিকল্পনা করছেন সাগরে নিমজ্জিত সাবমেরিন সংগ্রহের। স্বচ্ছ, আধুনিক এবং দেশের মানুষ ও স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতি অবিচল আস্থা ও নিষ্ঠাই শেখ হাসিনার চলার পথের একমাত্র পাথেয়। 

রচনাসমগ্র-এক এর প্রতিটি লেখায় লেখক দেশের প্রতি তাঁর নিরঙ্কুশ দায়বদ্ধতা, নিবিড় স্নেহসিক্ত মমতা এবং উন্নয়নের অঙ্গীকার প্রকাশ করেছেন। সহজ সরল বাক্যে রচনাবলী সাধারণ পাঠকদের কাছে ইতিমধ্যে গ্রহণীয় হয়েছে।  

রচনাসমগ্র-দুই এর বইয়ের নাম যথাক্রমে- ‘সহে না মানবতার অবমাননা, সাদা কালো, সবুজ মাঠ পেরিয়ে এবং তিনটি অগ্রন্থিত রচনা। 

আমি শুরুতেই শেষের দিকের অগ্রন্থিত রচনার একটি ‘আমি মা’ নিয়ে আলোচনা করবো। ‘আমি মা’-দুটি শব্দ কিন্তু অনুভবে অঙ্গীকারে পৃথিবী জোড়া। হোক রাস্তার ফুটপাতের একজন মায়ের কোল, হোক হাজার কোটি টাকা মালিকের মায়ের কোল, উষ্ণতা, অনুরাগ, স্নেহ, বাৎসল্য এক এবং চিরকাল অভিন্ন। সেই অভিন্ন অনুভবের অনুরাগ থেকে লেখক লিখছেন ‘আমি মা’। মানব মা জাতির সমগ্র সত্তাকে নিজস্ব চিন্তার আলোয় আলোকিত স্রোতের সঙ্গে বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসকে ধারণ করে এক অনবদ্য লেখা ‘আমি মা’। ‘মা’ পৃথিবীর সব চেয়ে ছোট শব্দ কিন্তু অুনভবে সমুদ্র সমান। একজন মা-ই জানেন সন্তান ধারণের, সন্তান জন্ম দেয়ার বিষাদ বেদনা, সন্তান জন্ম দেয়ার বিশাল আনন্দ সুখ। সেই মা যখন নিজের এবং অন্য জননীর সন্তানের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, সেই প্রশ্ন হয়ে ওঠে শাশ্বতকালের। 

প্রবন্ধকার শেখ হাসিনার জন্ম, বেড়ে ওঠা উপমহাদেশের অন্যতম একটি রাজনৈতিক পরিবারে। এই রাজনীতি তাঁর জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে, অনেকটা চোখের সঙ্গে দৃষ্টির মতো। সুতরাং তিনি যেখানেই যাবেন, যে ভাষ্যই দেবেন রাজনীতি এবং স্মৃতি তুমুল বৃষ্টির মতো আসবেই। যেমন এসেছে এই লেখায়ও। শুরুতেই তিনি নিয়ে এসেছেন একাত্তর, বঙ্গবন্ধু আর তাঁর পুত্র জয়কে। কীভাবে? পাঠ করুন- ‘১৯৭১ সালের জুলাই মাস। ধানমন্ডির ১৮ নং সড়কের একতলা একটা ছোট বাড়ি। এই বাড়িতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বন্দী করে রেখেছিল আমার মাকে। সাথে জামাল, রেহানা, রাসেল। আমি ও আমার স্বামী, খোকা কাকা, চাচী ও তাদের ছেলে। আমি সন্তান সম্ভাবনা। মার্চ মাসের ২৩ তারিখে আব্বা যেদিন পতাকা তুললেন নিজের হাতে, সেদিনই আমাকে বললেন, ‘তোর ছেলে স্বাধীন দেশের নাগরিক হবে। তোর ছেলের নাম রাখবি জয়।’ জয় তখন চার মাসের পেটে। প্রথম সন্তান আমার কোলে আসবে, মাতৃত্বের স্বাদ পেতে যাচ্ছি। সে এক অন্যরকম অুনুভূতি যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।’ 

এই হচ্ছে চিরকালের বাঙালি মায়ের শাশ্বত প্রতিকৃতি শেখ হাসিনা। নিজের প্রথম মাতৃত্বের অনুভব প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি জগতের সব মায়ের প্রতিধ্বনি করছেন। অনিবার্যভাবে আমি মা লেখায়ও মুক্তিযুদ্ধ এসেছে। শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এমন এক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন বাংলায়, জীবনের যে দিকে মুখ ঘোরাবেন, দৃষ্টি রাখবেন, রাজনীতি দেখতে পাবেনই। 

‘আমি মা’ লেখায় শেখ হাসিনা বর্ণনা করেছেন নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায়, একাত্তরের নয় মাস কীভাবে বন্দী জীবন কাটিয়েছেন, কীভাবে জনক নিহত হওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে লড়াই করেছেন, তার আদ্যপান্ত। আবার যখন দেশের মানুষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে দেশে ফিরে এসেছেন, কিন্তু স্বৈরশাসকদের কারণে পিতার মতো কারাগারে যেতে হয়েছে। জেলে থাকার কারণে তিনি তাঁর সন্তানদের পাশে সব সমযে থাকতে পারেননি। এই বেদনা তিনি তুলে ধরেছেন।

রাজনীতির শেকলে একজন মা কতোটা অসহায়, তার অবাক বর্ণনা দিয়েছেন শেখ হাসিনা ২০০৭ সালের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে। তার একমাত্র কন্যা পুুতুল মা হবে। থাকেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। মা হিসেবে মেয়ের কাছে থাকাটা খুব জরুরি। যাওয়ার জন্য টিকিটও বুক করেছেন। কিন্তু যেতে পারেননি। কেন? সেই সময়ের প্রশাসন আটকে দিয়েছে যাত্রা। এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন- ‘আমিতো মা- আমার মেয়ের জন্য মনটা ভীষণ খারাপ। এখনই মাঝে মাঝে একটা ব্যথা হয়। বাব বার ফোনে জিজ্ঞেস করে, ‘মা কখন আসবা?’ আমি কি জবাব দেব? সরাসরি বলতে পারছি না আমি এক রকম বন্দী জীবন যাপন করছি, কাউকে আসতেও দেয় না। আমাকে যেতে দেবে না বর্তমান সরকার।’

আরতো মাত্র ক’দিন। যেকেনো সময়েই ওকে হাসপাতালে যেতে হবে। ব্যথায় যখন কষ্ট পাবে মা হয়ে পাশে থাকতে পারবো না। ‘মা’ ‘মা’ বলে যখন ডাকবে, মাকে তো পাবে না। যে কষ্ট ১৯৭১ সালে আমি পেয়েছিলাম আমার মেয়ে কেন সেই কষ্ট পাবে? আমরা না স্বাধীন দেশে বাস করছি? 
‘মা পুতুল তোমার মা তোমার কাছে যেতে পারল না মা, মার এই অক্ষমতা ক্ষমা করিস মা।’
আমি জানতে চাই আমার কি অপরাধ যে মা হয়ে আমার মেয়ের পাশে থাকতে পারব না, আমরা কি তবে সেই ১৯৭১ সালেই আছি?’

স্থানের অভাববোধের কারণে, শেখ হাসিনার রচনা সমগ্র-দুই এর বিশদ আলোচনায় যেতে পারলাম না। ভবিষ্যতে দ্বিতীয় খণ্ড নিয়ে বিশদ আলোচনা করার ইচ্ছে রইলো। বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রুচিশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মওলা ব্রাদার্স রচনাসমগ্র-এক ও দুই প্রকাশ করেছে। সাদা কাগজে ঝকঝকে ছাপা দুই খণ্ড রচনাবলী বাংলায় নিবেদিত যেকেনো বাঙালির ভালো লাগবে। কারণ, শেখ হাসিনার রচনার মধ্যে বাংলার ইতিহাস জায়গা করে নিয়েছে আপন চরিত্রের প্রয়োগেই। লোকায়াত বাংলার চিত্রপটে দারুণ প্রচ্ছদ এঁকেছেন বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী।