শোক প্রকাশের নামে দলীয় রাজনীতি

আব্দুল গাফফার চৌধুরী

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০১:২৩ পিএম, ২ এপ্রিল ২০১৯ মঙ্গলবার | আপডেট: ০১:২৫ পিএম, ২ এপ্রিল ২০১৯ মঙ্গলবার

ফাইল ছবি।

ফাইল ছবি।

সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি গল্প আছে, নিজের স্মরণ থেকে এখানে তা উল্লেখ করছি। টম আর ডিক দুই বন্ধু। একদিন তারা রাস্তায় একটি ১০০ ডলারের নোট কুড়িয়ে পেল। টম বলল, সে নোটটা রাস্তায় আগে দেখেছে, এটা তার প্রাপ্য। ডিক বলল, সে আগে রাস্তা থেকে নোটটা তুলেছে, ওটা তার প্রাপ্য। অনেক তর্কাতর্কির পর ঠিক হলো তারা দুজনে মিথ্যা কথা বলার প্রতিযোগিতা করবে। যে জিতবে সে টাকাটা পাবে।

রাস্তায় দাঁড়িয়েই তারা মিথ্যা কথা বলার প্রতিযোগিতা শুরু করে দিল। ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন এক পাদ্রি সাহেব। তিনি দুই বন্ধুকে অনবরত মিথ্যা বলতে শুনে তাদের কাছে গেলেন। বললেন, ‘ছিঃ ছিঃ বাবারা, মিথ্যা কথা বলা মহাপাপ জেনেও মিথ্যা বলছ! জানো, জীবনে আমি কখনো মিথ্যা বলিনি।’ তাঁর কথা শুনে টম আর ডিক দুজনই তাঁকে প্রণাম করল। ডলারের নোটটা তাঁর পায়ের কাছে রেখে বলল, ফাদার, এই টাকাটা আপনার প্রাপ্য। জীবনে একটাও মিথ্যা বলেননি, এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর হয় না।

গল্পটা মনে পড়ল নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে সন্ত্রাসীর গুলিতে যে অসংখ্য নামাজি নির্মমভাবে নিহত হয়েছে, তাদের জন্য ঢাকায় শোকসভা অনুষ্ঠানের খবর দেখে। ক্রাইস্টচার্চে যে বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তাতে বিশ্বের সব শান্তিপ্রিয় মানুষ শোকস্তব্ধ। নিউজিল্যান্ডের মানুষও তাই। এই বর্বরতার প্রতিবাদ করার ভাষা যেন কারো জানা নেই। ঢাকায়ও এ জন্য শোক প্রকাশ ও প্রতিবাদ জানানোর জন্য সভা হয়েছে।

এই সভাটি সর্বদলীয় নাগরিক শোকসভা অথবা প্রতিবাদসভা হলে ভালো হতো। প্রতিবাদ করে এ ধরনের বর্বরতা বন্ধ করা যাবে না। পশ্চিমা সরকারগুলো যে ইসলামোফোবিয়া বিশ্বজুড়ে ছড়াচ্ছে তারই প্রতিক্রিয়া এই মুসলমানবিদ্বেষী সন্ত্রাস। একজন-দুজন সন্ত্রাসী ধরা পড়লে তাদের শাস্তি দিয়ে এই সন্ত্রাস বন্ধ করা যাবে না। সন্ত্রাসের উৎসমুখে হাত দিতে হবে। এই উৎসমুখ হচ্ছে খ্রিস্টান শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের মধ্যে অতি জাতীয়তাবাদ প্রচার এবং ইসলাম একটি সন্ত্রাসী ধর্ম, এই তত্ত্ব ছড়ানো। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ফ্যাসিবাদী অতি জাতীয়তাবাদের সাহায্যেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। ইউরোপের আরো কোনো কোনো দেশে এই শ্বেতাঙ্গ অতি জাতীয়তাবাদ, বর্ণবিদ্বেষ ও বহিরাগত বিদ্বেষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভয়ংকর সন্ত্রাসের জন্ম দিচ্ছে। আগে তার ভিত্তি ছিল ইহুদিবিদ্বেষ, এখন তার ভিত্তি ইসলাম ও মুসলমানবিদ্বেষ। ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল এখন এই শ্বেত সন্ত্রাসের সহযোগী।

ঢাকায় নিউজিল্যান্ডের ঘটনা নিয়ে একটি সর্বদলীয় নাগরিক সভা ডেকে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে তাদের ইসলামোফোবিয়া প্রচার বন্ধ করা এবং একজন-দুজন সন্ত্রাসীকে শাস্তিদান নয়, সব শ্বেতাঙ্গ এবং খ্রিস্টান সন্ত্রাসী দলগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো দরকার ছিল। ইসলামী সন্ত্রাসী দলগুলোকে (যাদের পশ্চিমা দেশগুলোই কমিউনিজম দমনের জন্য তৈরি করেছিল) দমনের নামে পশ্চিমা দেশগুলো যদি ভয়াবহ মারণাস্ত্র হাতে যুদ্ধে নামতে পারে, তাহলে এই বর্ণবাদ ও বহিরাগত বিদ্বেষী এবং মুসলমানবিরোধী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অনুরূপ না হোক কার্যকর কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে তারা অনিচ্ছুক কেন? ডোনাল্ড ট্রাম্প তো তাঁর দেশে বর্ণবাদী দাঙ্গাকারীরাও ভালো মানুষ বলে প্রশংসা করেছেন।

বিশ্বব্যাপী দল-মত-নির্বিশেষে শান্তিকামী মানুষের দাবি হচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকায় যে নিও-ফ্যাসিবাদ মাথা তুলছে তাকে রোখো। ঢাকায় শোকসভায় এই দাবিটি ওঠেনি। বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতি এবং ধর্মীয় সন্ত্রাসের যারা পৃষ্ঠপোষক সেসব দলের নেতা ও সমর্থকদের সভায় দাঁড়িয়ে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের মতো ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘ধর্মকে ক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যবহার করা হচ্ছে।’ কথাটা ‘প্রেজেন্ট টেন্সে’ বলা হয়েছে। কথাটা নিউজিল্যান্ডের ঘটনা নিয়ে নয়, বাংলাদেশের অতীতের ঘটনা নিয়ে নয়, বাংলাদেশ এবং তার বর্তমান নিয়ে বলা হয়েছে। টার্গেট হাসিনা সরকার। নিউজিল্যান্ডের হতভাগ্য মানুষগুলোর জন্য শোক প্রকাশ একটা মুখোশ।

এ জন্যই সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পটা দিয়ে আজকের লেখাটা। সবচেয়ে বড় মিথ্যাটা বলে পাদ্রি সাহেব যেমন বলেছিলেন, ‘আমি কখনো মিথ্যা বলিনি’, ড. কামাল হোসেন তেমনি দেশে যারা ধর্মীয় রাজনীতি ও সন্ত্রাস ছড়িয়ে ক্ষমতায় গিয়েছিলেন এবং এখনো যেতে চান তাঁদের গত নির্বাচনেও সহায়তা দিয়ে বর্তমানে ধর্মকে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলে পাদ্রি সাহেবের মতো নিজেকে সৎ প্রমাণের চেষ্টা করছেন। ঢাকার এই সভাটি নিউজিল্যান্ডের নারকীয় ঘটনার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ সভা হলে এটা হতো ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদসভা। কিন্তু  সভার বক্তাদের নাম এবং বক্তব্য শুনে বুঝতে বাকি থাকে না, এটা কাদের এবং কী উদ্দেশ্যে এই সভা!

ড. কামাল হোসেন দাবি করেছেন, ক্ষমতার জন্য ধর্মের ব্যবহার তিনি (তাঁরা) বন্ধ করেছেন এবং বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু তিনি কি জানেন না, তিনি এখন কাদের সঙ্গে আছেন? ধর্মান্ধ ফ্যাসিবাদী দল জামায়াত এবং সাম্প্রদায়িক বিএনপির সঙ্গে নয় কি? তিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিন্দা জানানোর জন্য সভা করছেন। কিন্তু যেসব দলের নেতা, সমর্থক ও বুদ্ধিজীবীদের সভায় বক্তৃতা করছেন, সেসব দল—বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত বছর কয়েক আগেও দেশের নিরীহ মানুষ হত্যার নৃশংস অভিযান চালিয়েছিল। সেই সন্ত্রাসী হামলায় নিহত নিরীহ মানুষের সংখ্যা ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে নিহত নামাজিদের চেয়ে অনেক বেশি। পবিত্র রমজান  মাসেও বিএনপি ও জামায়াত দেশময় সন্ত্রাস চালিয়েছে। মুসলমান হত্যা করেছে।

বিএনপির অভিভাবক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আরেক সত্যবাদী যুধিষ্ঠির। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে মসজিদে সন্ত্রাস ঘটেনি। ঘটেছে গুলশানের হলি আর্টিজানে। কেন সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে হত্যার জন্য হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মসজিদ প্রাঙ্গণে বোমা হামলা চালানো হয়নি? এক নিরীহ কনস্টেবলকে ঢাকায় পল্টনের মাঠসংলগ্ন এক মসজিদে টেনে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়নি? হিন্দু মন্দির, বৌদ্ধ মঠ ধ্বংস এবং গির্জায় বোমা পুঁতে রাখা হয়নি?

বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খানের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, ‘চোরের মায়ের বড় গলা’ কথাটা সত্য। তিনি এবং জাফরুল্লাহ চৌধুরী আভাসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে খাটো করার জন্য নিউজিল্যান্ডের মহিলা প্রধানমন্ত্রীর অতি প্রশংসা করেছেন। তিনি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু শেখ হাসিনা মিয়ানমারের গণহত্যা এবং বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থী সমস্যার মোকাবেলা করে যে সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছেন, তা বলতে ভুলে গেছেন।

বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান আরো বলেছেন, ‘আমাদের দেশে অনেক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দেশে শত শত লোক লঞ্চডুবিতে বা রেল দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর কাউকে পদত্যাগ করতে দেখিনি।’ এই আক্রমণের লক্ষ্য হাসিনা সরকার। কিন্তু বিএনপি সরকারের আমলে অসংখ্য বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতা হত্যা এবং শেখ হাসিনার সভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর যেখানে খালেদা জিয়ারই পদত্যাগ করা উচিত ছিল, সেখানে তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও পদত্যাগ করেছিলেন কি? তাঁরা কেউ এ জন্য দুঃখ প্রকাশও করেছেন কি?

নিউজিল্যান্ডের নিহত মানুষের জন্য শোক প্রকাশের নামে বিএনপি-জামায়াতের এই রাজনৈতিক শোকসভার এবং দল দুটির ‘দেশরত্ন বুদ্ধিজীবীদের’ এই সমাবেশের খবর পড়ে মনে হলো, এই রাজনৈতিক এতিমরা এখন খড়কুটো আশ্রয় করেও বাঁচতে চায়। ধর্মকে তারা রাজনৈতিক স্বার্থে কলঙ্কিত করেছে। এখন নিউজিল্যান্ডের হতভাগ্য মানুষগুলোর জন্য শোক প্রকাশকেও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়।