সাদামাটা ছোটবেলা

মুস্তাফিজ রনি

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ১০:২৪ পিএম, ৭ এপ্রিল ২০১৯ রবিবার | আপডেট: ১০:২৬ পিএম, ৭ এপ্রিল ২০১৯ রবিবার

মুস্তাফিজ রনি।

মুস্তাফিজ রনি।

ইন্টারমিডিয়েট লেভেলে প্রথম ফেসবুক সম্পর্কে জানতে পারলাম। আমার সেই আমলের আইফোন ‘নোকিয়া ই-৫’ মোবাইলে যে ফেসবুক অ্যাপ ইন্সটল করা ছিলো সেটা জানতামই না। বন্ধু জিহাদ আর বাসার মিলে ২০ টাকায় ১০ এমবি নেট কিনেছিলো। সেইটা দিয়ে ফেসবুকে ঢুকেছিলো। তারা নিজেরাও ততটা ফেসবুক সম্পর্কে জানতো না। কিন্তু তখন মনে হতো তারা কতবড় আইটি এক্সপার্ট। সেদিনের পর ইন্টারনেট সম্পর্কেও কিছুটা ধারণা হলো। এরপর শহরে গেলেই ২০ টাকায় এক ঘন্টা নেট চালানোর জন্য সাইবার ক্যাফেতে যেতাম। নেটে যখন ঢুকতাম, তখন তো মনে হতো আমি আর পাবনা শহরেই নেই। আমার পিঠে পাখা গজিয়েছে আর আমি উড়ে বেড়াচ্ছি। এরপর মোবাইলেই নেট কিনে সাইবার জগতে ঘুরে বেড়াতাম। তবে সেটাও খুব অল্প সময়ের জন্য। কারণ নেটের যে দাম ছিলো তাতে ১০ এমবি খরচ হতে খুব বেশি সময় লাগতো না। আর পকেট ভর্তি টাকা ছিলো না যে জিবি জিবি নেট কিনবো।

২০১২ সালে দেখলাম হৃত্বিকের ‘Krrish’ মুভিটা। সেখানে প্রিয়াংকা চোপড়ার হাতের ক্যামেরা দেখে মনে হতো আমার যদি এমন একটা ক্যামেরা থাকতো। ২০১২ এর শেষে যখন ওইরকম ডিজিটাল ক্যামেরা হাতে পেলাম তখন তো পুরো গ্রামের পোলাপাইনের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গেছিলাম। এখনকার মতো তখন হাতে হাতে ডিএসএলআর ছিলো না। পুরো গ্রামে হাতে গোনা দুই/একটা ক্যামেরা থাকতো।

২০১৩’র জানুয়ারিতে যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু করলাম, তখনও ফোন, ল্যাপটপ, আর প্রযুক্তি নিয়ে পড়ে থাকতাম না। নতুন ফেসবুক খুলেছি তবুও বন্ধুরা বসে টুকিটাকি চত্বর, মিডিয়া চত্বর, ইবলিশ চত্বর, পরিবহন মার্কেট, প্যারিস রোড আর হলগুলোর মোড়ে মোড়ে আড্ডা জমিয়ে তুলতাম। গান, মাস্তি, আড্ডা, আলোচনা, অনুষ্ঠান আয়োজন আর আন্দোলনেও ছিলো অবাধ বিচরণ।

আমরা যখন ক্লাস এইট/নাইনে পড়তাম তখন বালাম, হৃদয় খান, ন্যান্সি, আসিফ এদের ক্রেজ ছিলো। আর নগর বাউল ও এলআরবি-তো আমাদের কাছে সবসময়ই অন্য উচ্চতায়। ব্যান্ডের মধ্যে শিরোনামহীন, ওয়ারফেজ, অর্থহীন ব্যাপক জনপ্রিয়। নোকিয়া ১১০০ মডেলে স্নেক গেম খেলেনি এমন ছেলেমেয়ে খুজে পাওয়া দুস্কর। আর কম্পিউটার গেমিংয়ে ছিলো ‘GTA Vice City’, ‘IGI’, ‘EA Sports’ এগুলো। তবে সবচেয়ে ভালো ছিলো তখনকার টিভি অনুষ্ঠানগুলো। আলিফ লায়লা, সিনবাদ, টম এন্ড জেরি, ইত্যাদি, আলমগীর/শাবানা বা সালমান শাহ/শাবনুরের ছবি দেখার জন্য টিভি রুমে ভীড় পড়ে যেতো। আর তখনকার টিভি নাটকগুলো এখনকার মতো ন্যাকামি-ভাড়ামি দিয়ে ভর্তি ছিলো না বা কাতুকুতু দিয়ে জোর করে হাসানোর মতো ছিলো না। তখনকার চঞ্চল, মোশাররফ করিম, জাহিদ হাসান সত্যি সত্যিই অভিনয় দিয়ে হাসাতো। আর হুমায়ুন ফরিদি, আজিজুল হাকিম, মীর সাব্বির, তারিন, অপি করিম, বিপাশা হায়াত, সুবর্ণা মুস্তফাদের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হতাম।

আমাদের তখন পার্টি মানেই রেস্টুরেন্ট যাওয়া ছিলো না। এর/ওর বাড়ি থেকে চাল-ডাল-পেঁয়াজ-তেল-বাসন-লাকড়ি নিয়ে খোলা মাঠে পিকনিক হতো। আমাদের বিকেল কাটতো মাঠে-ঘাটে, খেলার মাঠে, কিংবা গলির মোড়ে এক বন্ধু আরেক বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে অকৃত্রিম হাসি আর দুষ্টুমিতে। আমাদের তখন ‘গার্লফ্রেন্ড’-কে ফোন করার সময় বুক ধুকপুক করতো। ফোন করার সময় আগে সিওর হয়ে নিতে হতো তার বাবা কিংবা মা ফোন উঠায়নি। কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা চিঠিগুলোতে হয়ত শব্দের কমতি হতো কিন্তু ভালোবাসার কমতি থাকতো না। আর সেই চিঠি পৌঁছানো ছিলো আরেক কঠিন ইতিহাস। মাঝে মাঝে চিঠি চলে যেতো স্যারের হাতে। আর দেয়াল, গাছ, কিংবা ট্যুরিস্ট প্লেসগুলোতে A+B, R+S এসব লেখা যেন এখন হারিয়েই গেছে। জানিনা সেই প্লাসগুলো জোড়া লেগেছে নাকি এখন মাইনাস হয়ে গেছে।

বিকেল হলেই আড্ডা দেয়া বা খেলতে যাওয়া আর কয়েকদিনের ছুটি পেলেই কোথাও ঘুরতে যাওয়া ছিলো আমাদের ছেলেবেলার অন্যতম স্মৃতি। টিফিনের টাকা জমিয়ে বা মায়ের কাছে হাজারবার আবদার করে পাওয়া টাকা দিয়ে বল/ব্যাট কিনতাম। একবার বল হারালে কিংবা ব্যাট ভাংলে কেনার সামর্থ ছিলো না। তখন ঘরের কোনায় রাখা কাঠ দিয়ে ব্যাট বানাতাম। সোলা কিংবা বাশের কঞ্চি দিয়ে স্ট্যাম্প বানাতাম। তখন বৃষ্টি হলেই ফুটবল নিয়ে মাঠে ছুটতাম। বাড়ি ফিরে মায়ের হাতের মার খেতাম। তাও পরদিন খেলতে যেতাম। ফুটবল ফেটে গেলে জাম্বুরা, কাগজ আর পলিথিন পেচিয়ে ফুটবল বানাতাম। তখন ৮/১০ জন বন্ধু একসাথে হলেই হৈ-হুল্লোর করে মাঠে যেতাম, স্কুলের ক্লাস পালিয়ে খেলতে যেতাম, টিফিন পিরিয়ডে পালিয়ে পাড়া ঘুরে বেড়ানো ছিলো অন্যতম শখ। তখন এক/দুই টাকার আইসক্রিমগুলোতে যে স্বাদ আর তৃপ্তি পেতাম এখন ৫০/৬০ টাকার কেনা আইসক্রিমেও সেই স্বাদ পাইনা। এখন বল/ব্যাট কেনার জন্য টাকা আছে, পুরোনো ব্যাটবলগুলোও হয়ত পড়ে আছে, কিন্তু মাঠে যাবার মতো সেই ৮/১০জন বন্ধু নেই। জীবনও এত জটিলতায় পূর্ণ ছিলো না।

আহারে সেই সময়গুলো। এখন সবই প্রযুক্তির ছায়ায় চাপা পড়ে গেছে। সেই সময়, বন্ধুরা আর নেই। তাদের জায়গায় ল্যাপটপ, এন্ড্রোয়েড, ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়া দখল করে নিয়েছে। সোশাল মিডিয়া আমাদের সোশালি কানেক্টেড তো করেছে কিন্তু সোশাল স্ট্রাকচারই দুর্বল করে দিয়েছে। আর সেই দুর্বল স্ট্রাকচারের উপর যতই শক্তিশালী কানেকশনের পিলার দাড় করানো হোক, তা আর টিকছে না। প্রযুক্তি বিনা জীবনটা হয়ত সাদামাটা ছিলো। কিন্তু এখনকার মতো কাটখোট্টা আর একাকীত্ব ছিলো না। হাজার মানুষের ভীড়েও এখন একাকী মনে হয় নিজেকে। খুব মনে পড়ছে ছোটবেলা। 

লেখক: শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়