সিনেমাকেও হার মানায় প্রতিবন্ধী রিফাতের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৬:০৮ পিএম, ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ মঙ্গলবার

রিফাত রায়হান (৭)। বাড়ি নাটোরের বড়াইগ্রাম পৌরসভার লক্ষীকোলে। পৃথিবীতে প্রতিটি সন্তানের জন্মই আনন্দের। কিন্তু জন্মই যেন আজন্ম পাপ-কথাটির মূর্ত প্রতীক যেন রিফাত। তার জন্মের পরপরই সন্তান প্রতিবন্ধী জেনে মা আত্মহত্যা করেছে, আর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে হয়েছে দেশান্তরী।

জন্মের মাত্র তিন মাসের মাথায় বাবা-মা দুজনকেই হারিয়ে শিশু রিফাতের জীবন যেন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। জন্মের পর বাবা-মায়ের কোলে বড় হওয়ার কথা থাকলেও এটাই এখন রিফাতের জীবনের নির্মম বাস্তবতা।

জানা যায়, ২০১৬ সালের জুনে রিফাতের জন্ম। মেয়ের পর ছেলে হওয়ায় স্বজনরা বেশ খুশীই। কিন্তু সে খুশী যে সাময়িক তা ছিল অজানা। মাত্র আড়াই মাস বয়সে নিউমোনিয়ার কারণে হাসপাতালে নিলে শিশুটি প্রতিবন্ধী হবে বলে স্বজনদের জানান চিকিৎসক। বিষয়টি কোন ভাবেই মানতে পারেননি রিফাতের মা রিমা খাতুন। খবরটি জেনে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ার এক মাসের মাথায় গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।

এ ঘটনার ৩৯ দিনের মাথায় তার পিতা ইব্রাহিম দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কিন্তু সৎমা প্রতিবন্ধী সন্তানকে মেনে নিতে রাজি হয়নি। কয়েকদিন পর দ্বিতীয় স্ত্রীসহ ইব্রাহিম মেয়ে আর প্রতিবন্ধী ছেলেকে ফেলে গোপনে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন। এভাবেই শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেয়ায় পৃথিবীতে সবচেয়ে নির্ভরতার স্থান বাবা-মাকে হারালো রিফাত।

এ অবস্থায় রিফাতসহ তার বড় বোনের দায়িত্ব এসে পড়লো বৃদ্ধ দাদা-দাদীর উপর। এরই মধ্যে বছর খানেক আগে আকস্মিক নিখোঁজ হয়ে গেলো রিফাতের দাদা। বাধ্য হয়ে নাতনী ইশরাত জাহানকে এতিমখানায় দিয়ে দেন দাদী। আর নাতিসহ নিজের আহার জোটাতে বর্তমানে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন বৃদ্ধ দাদী তহুরা বেগম।

সোমবার সরেজমিনে তহুরা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সাত বছরের শিশুটির শারীরিক বৃদ্ধি খুবই কম। দুটি পা ও কোমড় যথেষ্ঠ চিকন। ফলে নিজ পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি নেই তার। মুখে কিছুটা বয়স্ক মানুষের ছাপ। বাক শক্তিহীন শিশুটি সব সময়ই শুয়ে থাকে। কোন কোন সময় নিজেই নিজের হাত-পা কামড়ে রক্তাক্ত করে ফেলে। ঠিকমত তিন বেলা খাবার না জোটায় শিশুটি ভূগছে চরম পুষ্টিহীনতায়।

এ সময় রিফাতের দাদী তহুরা বেগম জানান, এ পর্যন্ত প্রতিবন্ধী বাচ্চা বা নিজে কোন সরকারী ভাতা পাই না। ঔষধপত্র তো দুরের কথা, ঠিকমত তিন বেলা ভাতই জোটাতে পারি না। মাঝে মাঝে মনে হয় নিজেও আত্মহত্যা করে এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি নেই। কিন্তু আমি মরে গেলে প্রতিবন্ধী নাতিটাকে কে দেখবে এই আশঙ্কায় আত্মত্যাও করতে পারি না। এ অবস্থায় সমাজের বৃত্তবানরা যদি একটু সহযোগিতার হাত বাড়াতেন তাহলে অসহায় নাতিটাকে চিকিৎসা করানোসহ তার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে পারতেন বলে

উপজেলা সমাজসেবা সম্পাদক তারিক এলাহী জানান, বাচ্চাটির পাশে না থেকে তার বাবা-মায়ের এমন সিদ্ধান্ত খুবই অমানবিক। তবে এ উপজেলায় আমি নতুন এসেছি। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে যতটুকু করা সম্ভব আমি করবো।

বড়াইগ্রাম পৌরসভার মেয়র আব্দুল বারেক সরদার জানান, সরকারীভাবে প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার জন্য যে বয়স নির্ধারিত রয়েছে বাচ্চাটির সে বয়স হয়নি। তবে তার দাদীকে কোন ভাতা দেয়া যায় কিনা সে ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।