সোহাগ আলীর ‘টিন-কৃষি’

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৭:০৭ পিএম, ৯ নভেম্বর ২০১৯ শনিবার

নাগরিক জীবনে বহুতল ভবনের ছাদে কৃষির চাষাবাদ করা মোটামুটি পরিচিতি পেয়েছে। গ্রামীণ জীবনেও বাড়ির উঠোনে লাগানো সবজি গাছ বাড়তে বাড়তে টিনের চালে উঠে যায় এটাও খুবই সাধারণ একটা বিষয়। কিন্তু পরিকল্পনা করে টিনের চালের টবে শাকসবজি ও ফল গাছ রোপন করে চাষাবাদ করা ব্যতিক্রমই বটে!

অথচ এমন ব্যতিক্রম কাজটিই করেছেন নগরীর তেরোখাদিয়া উত্তরপাড়া মহল্লার বাসিন্দা সোহাগ আলী। তিনি রাজশাহীর স্থানীয় একটি পত্রিকায় ফটোসাংবাদিকের কাজ করেন। তার বাবা মতিউর রহমান রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী।

সোহাগের তেরোখাদিয়ার বাড়িতে গেলে দেখা যায়, ছাপরাঘরের টিনের চালে নানা জাতের ফল ও শাকসবজির চাষাবাদ করা হচ্ছে। সোহাগ আলী এর নাম দিয়েছেন ‘টিন কৃষি’। ইতোমধ্যে সেই টিন কৃষিতে চাষাবাদ করে তিনি নানা জাতের সবজি ও ফল উৎপাদন করেছেন। উৎপাদিত সবজি দিয়ে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে পাড়াপ্রতিবেশি ও আত্মীয় স্বজনদেরকেও দিচ্ছেন।

সোহাগ আলী বলেন, ‘কম বেশি সবাই ছাদ কৃষির সাথে পরিচিত। দালান বাড়ির ছাদে অনেকেই শখ করে চাষাবাদ করেন। কিন্তু যারা নিম্নবিত্ত বা দরিদ্র তারা চাইলে তাদের বাড়ির টিনের চালে লাউ কুমড়া ছাড়াও সব জাতের সবজি ও ফলের চাষাবাদ করতে পারেন। টিনের উপর চাষাবাদ করা হয় বলে আমি এর নাম দিয়েছি ‘টিন-কৃষি’। ছাদ কৃষি হলে টিন কৃষি হবে না কেন!’

‘তেরোখাদিয়ার বাড়িটি ছাড়া নিজস্ব কোনো জায়গাজমি নেই। কিন্তু শখ রয়েছে শাকসবজি চাষ করার। সেই শখ থেকেই টিন কৃষির শুরু।’ -বলছিলেন সোহাগ আলী।

সম্প্রতি সোহাগের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাড়িটি একতলা টিনের ছাপরাঘর। সেই ছাপরাঘরের টিনের চালে সারি সারি টবে রাখা হয়েছে রোপনকৃত নানা জাতের ফল ও সবজির গাছ। টবগুলো পানি ও তেলের জারকিন, বালতি, পলিথিন, সিমেন্ট ও চটের ব্যাগ কেটে তৈরি করা। তারপর সেগুলোতে মাটি ভর্তি করে গাছগুলো রোপণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে গাছগুলোতে ধরেছে নানা জাতের শাকসবজি ও ফল।

শাকসবজির মধ্যে রয়েছে বেগুন, করলা, শসা, পুঁইশাক, টমেটো, সিম ও ওল। ফলের গাছের মধ্যে রয়েছে আম, পেয়ারা, কাগজি লেবু, বেদেনা, চায়না কমলা, আমড়া ও কদবেল। এছাড়া কয়েক জাতের মরিচ রয়েছে। পুরোটাই বিষমুক্ত পদ্ধতিতে এসব চাষ করা হয়।

সোহাগ আলী বলেন, শাকসবজিগুলো দ্রুত বড় হয়ে যায়। বেগুন, শসা, করলা, মরিচ কয়েকদিনের মধ্যেই বড় হয়ে যায়। বর্ষাকালে বেগুন খুব ধরে। কয়েকদিনের মধ্যেই বেগুন, করলা বড় হয়ে যায়। আর প্রচুর লেবু ধরে। কয়েক জাতের লেবু রয়েছে টিনের চালে।’

‘ফাঁকা ছাদটি পড়ে থাকা দেখে শখের বসে বছর খানেক আগে সোহাগ আলী টিনের চালে চাষাবাদ শুরু করেন। চারাগাছ রোপনের মাধ্যমেই তার চাষাবাদ শুরু। রোপন করার এক মাস পর থেকেই সবজি ও দুই থেকে তিন মাস পর ফল ধরেছে গাছে’ বলছিলেন সোহাগ আলী।

সোহাগ আলী বলেন, আমাদের চারজনের পরিবারের সবজির চাহিদা পূরণ হয়ে যায় এই টিনকৃষি থেকে। বসতবাড়ির টিনের চাল থেকে এটাই অনেক। চালটাতে আরো গাছের টব রাখা সম্ভব। পরিকল্পনা আছে পুরো চালেই সবজির চাষাবাদ করার। যেকেউ চাইলেই অল্প খরচে তার ছাদে সবজি ও ফল উৎপাদন করতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।
তবে টিনের চালে গাছের পরিচর্যা করা কঠিন বলে জানালেন সোহাগ আলী।

তিনি বলেন, ‘ফল গাছে দুই তিন দিন পর পানি দিলেও চলে কিন্তু শাকসবজির গাছে প্রতিদিন পানি দিতে হয়। টবের মাটি আলগা করে দিতে হয়। এছাড়া আগাছাও পরিষ্কার করতে হয়। টিনের চালে জায়গা কম থাকায় ও হালকা হওয়ায় পরিচর্যা করতে কষ্ট হয়’।

সোহাগ আলীর স্ত্রী লুৎফুন নাহার বৃষ্টি বলেন, ‘প্রথমে বিষয়টা অবাস্তব মনে হলেও এখন প্রতিদিন শাকসবজি পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন বিকেলে বিষমুক্ত সবজি দিয়ে তরকারি তৈরি করা যায়। নিজেদের চাহিদা মিটিয়েও পাড়াপ্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনদের দেয়া সম্ভব হয়। এটা খুব ভালো লাগে। ’

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. শামসুল হক জানান, ‘ছাদকৃষি কয়েক বছরের মধ্যেই পরিচিতি পেয়েছে। তবে টিন কৃষি বিষয়টা এই প্রথম। এখন অনেক কৃষকই টিন কৃষি শুরু করেছেন। দুইভাবে টিন কৃষি করা যায়, এক. ছাদের নিচে মাটিতে গোড়া রেখে তার কা- টিনের চালে তুলে দেয়া। আরেকটা হচ্ছে, টিনের চালে টবে মাটি ভর্তি করে সেখানে চারা রোপন করে চাষাবাদ করা। এতে অল্প খরচে সহজেই চাষাবাদ করা সম্ভব। এখন অনেক কৃষক টিন কৃষি শুরু করেছেন।’

শামসুল হক আরো বলেন, ‘রাজশাহী অঞ্চলে অনেক গরম পড়ে। সে জায়গায় টিনের উপর সবজি ও ফলের চাষাবাদ করা হলে ঘর ঠাণ্ডা থাকে। মানুষজন গরমের হাত থেকে রক্ষা পায়।’