ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নাশকতা ঠেকাতে গুচ্ছ পরিকল্পনা

ডেস্ক নিউজ

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ০৯:৫১ পিএম, ২ এপ্রিল ২০২১ শুক্রবার

টানা তিন দিনের তাণ্ডবের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নাশকতা দমন আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় নতুন একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন সংশ্নিষ্ট নীতিনির্ধারকরা। হেফাজতে ইসলামের ক্ষেত্রে আর `নরম নীতি` নয়- কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জেলাটিতে। যে কোনো ধরনের নাশকতা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মাঠ প্রশাসনকে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ একাধিক সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘাঁটি গেড়ে বসা কট্টর সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করতে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বাড়ানো হচ্ছে জেলাজুড়ে। তাছাড়া শিগগির বিশেষায়িত ইউনিট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) একটি ইউনিট স্থানান্তর করা হচ্ছে এ জেলায়। সেখানে র‌্যাবের একটি নতুন ব্যাটালিয়ন করারও চিন্তা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেন। পরে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বৈঠকে ভবিষ্যতে জেলাটিতে এ ধরনের নাশকতা ও তাণ্ডব ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসহ অন্যান্য সংস্থার জনবল বাড়ানোর বিষয়টি আলোচিত হয়। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি রোধে কী করণীয়, তা নিয়ে মাঠ কর্মকর্তারা তাদের মতামত তুলে ধরেন।

এ বৈঠকে র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান মনিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন, রেলওয়ে পুলিশের প্রধান মো. শাহ আলম, পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন্স) এম খুরশীদ হোসেন, ডিআইজি (মিডিয়া) হায়দার আলী খান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, বিজিবি ও আনসার বাহিনীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বৈঠকে বলেন, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সব বাহিনীর মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ বাড়াতে হবে। ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিতভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করতে হবে। যারা এসব সংঘাত-সহিসংতা ও তাণ্ডবে ইন্ধন এবং অর্থের জোগান দিচ্ছে, তাদের খুঁজে বের করতে গোয়েন্দাদের নির্দেশ দেন কর্মকর্তারা। সাধারণ মানুষ যাতে এসব নাশকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে আইনের আশ্রয় নিয়ে মামলা করেন, সে জন্য স্থানীয় থানা পুলিশের মাধ্যমে জনতাকে উদ্বুদ্ধ করারও নির্দেশ দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক হামলার ভিডিও বা স্থিরচিত্র সাধারণ মানুষের কাছে থাকলে তা পুলিশকে দেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়।


বৈঠক সূত্র জানায়, সেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শান্তিপ্রিয়, ধর্মপ্রাণ ও অসাম্প্রদায়িক জনসাধারণকে কট্টর সাম্প্রদায়িক অপশক্তির হস্তক্ষেপ ও হামলা থেকে রক্ষার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বৈঠকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় অন্তত ৩২ লাখ মানুষের বসবাস। সেখানে বিভিন্ন এলাকায় ৫৭৪টি মাদ্রাসা রয়েছে। এসব মাদ্রাসায় এক লাখ তিন হাজারের মতো শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে। কিন্তু বিভিন্ন ধর্ম-ব্যবসায়ী আলেম-ওলামা পরিচয়ধারী মাদ্রাসাছাত্রদের ভুল বুঝিয়ে রাস্তায় নামাচ্ছে। নাশকতা চালিয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট করা হচ্ছে। সর্বশেষ তাণ্ডবেও অন্তত তিন কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করা হয়েছে।

বৈঠকে আইজিপি সব মাঠ কর্মকর্তাকে হুঁশিয়ার করে বলেন, এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহি করতে হবে। নাশকতাকারীদের ছাড় দেওয়া যাবে না। সর্বোচ্চ কঠোর হতে হবে।

এর আগে পুলিশপ্রধান স্থানীয় কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের নিয়ে হেফাজতের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি হেফাজতের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন ও জেলা প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষকে পৃথকভাবে পাঁচ লাখ টাকার চেক তুলে দেন। জেলা প্রেস ক্লাবে মতবিনিময়ের পর সার্কিট হাউসে ব্রিফিং করেন আইজিপি।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হাটহাজারীসহ বিভিন্ন স্থানে হেফাজতে ইসলামের তা বের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আইজিপি বেনজীর আহমেদ সাংবাদিকদের সামনে বলেন, আমরা দেখছি প্রায় প্রতি বছরই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এমন ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটছে। একইভাবে হাটহাজারীতেও হামলা হচ্ছে। বারবার রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে। বারবার কেন রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে? হামলাকারীদের অবস্থান কি বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে?

পুলিশপ্রধান বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীকে স্পষ্ট করে বলতে চাই- ১৮ কোটি বাংলাদেশি আপনাদের সঙ্গে রয়েছে। একসঙ্গে আমরা ভয়কে অতিক্রম করব। কোনো বিশেষ গোষ্ঠী কোনো একটি অঞ্চলকে উপদ্রুত এলাকায় পরিণত করবে- এটা হতে দেব না।

পুলিশপ্রধান বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মানুষের নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে ঘুমানোর অধিকার আছে। এই অধিকার আমরা নিশ্চিত করব। যাদের কাছে হামলার ভিডিও এবং ছবি আছে, তারা যেন তা পুলিশকে সরবরাহ করেন; মামলা করেন। আমরা ব্যবস্থা নেব।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৫৭৪টি মাদ্রাসায় এক লাখ তিন হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, দিনে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে একশ টাকা খরচ হলে বছরে ৩৫০ কোটি টাকা খরচ হয় এসব মাদ্রাসায়। দ্বীনের খেদমতের জন্য এই খরচ আপনারাই (ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ) দিচ্ছেন। আসলেই কি তারা দ্বীনের খেদমত করছেন?

তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হাটহাজারীতে ভূমি অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামী ৫০ বছরেও এই রেকর্ড ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার হবে কিনা, সংশয় রয়েছে। হাজার হাজার মানুষকে ভুগতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে যার যার ধর্ম পালন করে থাকে উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, ধর্ম ব্যবসায়ী যারা, তাদের চরিত্রের দুটি দিক রয়েছে- তারা ওয়াজ করেন, আবার লাঠি নিয়ে মিছিলও করেন। আমাদের এখনই প্রকৃত ধার্মিক লোক ও ধর্ম ব্যবসায়ী- এ দুই শ্রেণির পার্থক্য বুঝতে হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের উদ্দেশে তিনি বলেন, `অনেক হুজুরের গাড়ি আছে দেখা যায়। তারা গাড়ি কেনার টাকা পান কোথায়? আমরা দ্বীনের জন্য দান-সদকা করব, টাকা দেব; ধর্ম ব্যবসার জন্য টাকা দেব না। সাহস রাখবেন; ধৈর্য হারাবেন না।`

হেফাজতের মামলার ব্যাপারে এক প্রশ্নের উত্তরে আইজিপি বলেন, মামলায় তদন্ত করে যার নাম আসবে তাদেরই গ্রেপ্তার করা হবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় পুলিশের পৃথক কমিটি হয়েছে। সেখানে পুলিশ অপেশাদার আচরণ করে থাকলে তারা বাহিনীতে থাকতে পারবে না।
ধর্মীয় নেতাদের রাজনীতি নিয়ে আইজিপি বলেন, রুহানি হুজুররা আধ্যাত্মিকতা বাদ দিয়ে রাজনীতি করেন। রাজনীতি করার অধিকার সবার আছে। তাই বলে ধ্বংস করতে হবে কেন?