মুক্তিযুদ্ধ ও করোনাকালে মানবিক পুলিশ

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ১১:১৭ এএম, ৫ জুন ২০২১ শনিবার

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

মুক্তির মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রয়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানামুখী ইতিবাচক অবদান। পাকিস্তানী সামরিক শাসকদের নির্মম শোষণ-শাসনের যাঁতাকলে প্রচন্ড বিপর্যস্ত ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক সংস্থাসমূহ।

জীবন ঝুঁকির বিনিময়ে বিভিন্ন সরকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে অপ্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দল আওয়ামী লীগকে নানা সহায়তা প্রদানের দৃষ্টান্ত সর্বত্রই সমাদৃত। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাসহ অনেক মামলা-হামলায় নির্দোষ অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মীর সঙ্গে বেশকিছু সরকারী আমলাসহ প্রতিরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও জড়িত করার নিকৃষ্ট অপচেষ্টা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সশস্ত্র মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক নিরস্ত্র সাধারণ জনগণকে হত্যা ও গণহত্যার প্রাক্কালে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স আক্রান্ত হলে দেশপ্রেমিক পুলিশ বাহিনী সর্বপ্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলে। সাম্প্রতিককালে হাতেগোনা কয়েকজন সদস্যের কুৎসিত অপকর্মের জন্য পুরো বাহিনীকে দায়ী করা কোনভাবেই যৌক্তিক নয়। জাতিরাষ্ট্রের কল্যাণে তাদের অবদানকে অবমূল্যায়ন করাও অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

জনশ্রুতিমতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্র, কৃষি, ডাক, রেলওয়ে, সেতু, নদী শাসনসহ প্রায় সকল ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে অতি স্বল্পসংখ্যক মেধাশূন্য, অযোগ্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ব্যক্তিবর্গের সুচতুর অপকৌশল অবলম্বন সংস্থা, প্রতিষ্ঠানের সুনাম যারপরনাই পর্যুদস্ত করে চলছে। কতিপয় ঘৃণ্য-ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে ক্ষমতা, অর্থ, আধিপত্যলিপ্সু হীন কর্তাব্যক্তিদের কারণে কোনভাবেই সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল সংস্থাকে অহেতুক কলঙ্কিত করা বাঙালী জাতিরাষ্ট্রের সমগ্র জনগোষ্ঠীর উপলব্ধিতে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।

 

মূলত রাজারবাগ প্রতিরোধ যুদ্ধের কারণেই বাংলাদেশ পুলিশকে স্বাধীনতা পদক দেয়া হয়। ২৫ মার্চ কালরাতে অকুতোভয় পুলিশ সদস্য দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ উদাহরণ স্থাপন করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত প্রায় বাতিল ৩০৩ রাইফেল দিয়ে হানাদার বাহিনীর অত্যাধুনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে পুলিশ সদস্যবৃন্দ শহীদের মর্যাদায় সমাসীন হন।

পাক বাহিনীর এই আক্রমণের বিষয়টি নির্ভীক পুলিশ তাদের বেতার মারফতে যে সংবাদটি সম্প্রচার করেছিল; সেটি ছিল ‘Base for all station of East Pakistan Police- keep listening, watch, we are already attacked by the Pak Army. Try to save yourselve, over.’ রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে রাজারবাগে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা অস্ত্রাগারের ঘণ্টা বাজিয়ে সকলকে সতর্ক ও একত্রিত করেন। কর্তব্যরত সেন্ট্রির রাইফেল থেকে গুলি করে অস্ত্রাগারের তালা ভেঙ্গে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকা পুলিশ সদস্যদের অনেকেই সন্তর্পণে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করতে সক্ষম হন।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল দেশের প্রথম বৈধ সরকার তথা মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তৎকালীন সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার জনাব মাহাবুব উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম ঐতিহাসিক গার্ড অব অনার প্রদান করেন। ১৯৭১ সালের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকেই বীর পুলিশ সদস্যরা প্রকাশ্যেই পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানকে সুস্পষ্ট ও পরবর্তীতে নয় মাসব্যাপী মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে অসাধারণ গৌরবগাথায় অভিষিক্ত হন।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে সরকার বা প্রশাসন অর্থে ফ্রান্সে পুলিশ নামকরণ করা হয়। ১৬৬৩ সালে রাতে পথঘাট পাহারা ও নজরদারির জন্য নৈশ প্রহরীর ব্যবস্থা করে। এটি ছিল সর্বপ্রথম আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। ইংল্যান্ডে ১৮০০ সালের ৩০ জুন দ্য গ্লাসগো পুলিশ এ্যাক্ট অনুমোদিত হয় এবং এই আইনের আওতায় সর্বপ্রথম স্কটল্যান্ডে গ্লাসগোতে পেশাদার পুলিশ সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

১৮২৯ সালে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে মেট্রোপলিটন পুলিশ এ্যাক্ট অনুমোদিত হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে থাকা স্যার রবার্ট পিলের নেতৃত্বে পীলার্শ বা ববীস নামে সদস্যদের নিয়ে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ পরিচিতি লাভ করে। এর অনুসরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৪৫ সালে নিউইয়র্কে সর্বপ্রথম সংগঠিত পুলিশ বাহিনীর অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা ইত্যাদি দেশে বিভিন্ন নামকরণে এই পুলিশ বাহিনীর কর্মপরিধির বিস্তৃতি ও মাতৃকতার সমৃদ্ধি ঘটে। ফ্রান্সের এই পুলিশ বাহিনীর প্রত্যয়গত উপাদান ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, যার দুটি ধারা যেমন প্রশাসনিক ও আইনগত পুলিশের কর্মকৌশল চিহ্নিত হয়।

উল্লেখ্য যে, পুলিশ বাহিনীর প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাস পর্যালোচনায় সরকারের অনুগত বাহিনী হিসেবে ১৭৮৯ সালে সংঘটিত ফরাসী বিল্পবের পর ফ্রান্সের রাজা হেনরি সমাজের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কয়েকটি বাহিনী গঠন করেন। এমন একটি সংস্থার প্রধান ছিল গ্যাবরিয়েল মন্টগোমারি, যার অন্যতম কাজ ছিল দুষ্কৃতকারী সম্পর্কে নানা কৌশলে সংবাদ সংগ্রহ করে রাজা হেনরিকে তা জানানো এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। সে সময় রাজা হেনরির বিরোধী পক্ষ ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ ছিল যে, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্মূলের জন্য সরকার এই বাহিনী সৃষ্টি করেছে।

পাক-ভারত উপমহাদেশে ১৮৬২ সালে ব্রিটিশ রাজ কর্তৃক পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও ভারতবর্ষে মোগল শাসন বা সুলতানী আমলে শহর অঞ্চলে কোতোয়াল পদমর্যাদায় পুলিশ দায়িত্বরত ছিল। সম্রাট আকবরের আমলে তিনভাগে বিভক্ত প্রশাসনিক কাঠামো বা মীর আদাল (সম্রাটের প্রধান প্রতিনিধি), কাজী (প্রধান বিচারক) এবং কোতোয়াল (বড় বড় শহরের প্রধান পুলিশ কর্মকর্তা) খ্যাত বিষয়টি ভারতবর্ষে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করে। এই ব্যবস্থা অনুসারে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ জেলা শহরের সদর পুলিশ স্টেশন কোতোয়ালি থানা বলে প্রসিদ্ধি লাভ করে। ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ বেনিয়ার শাসনকালে ভারতবর্ষে স্বতন্ত্র একটি পুলিশ বাহিনী গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ১৮৬১ সালে দ্য কমিশন অব দ্য পুলিশ এ্যাক্ট (&Act v of 1861) ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হয় এবং এরই অধীনে প্রতিটি প্রদেশে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (প্রদেশ পুলিশ প্রধান) এবং সুপারিনটেনটেন্ড অব পুলিশ (জেলা পুলিশ প্রধান) পদ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান আমলে ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশ পুলিশ হিসেবে এই প্রতিষ্ঠান কার্যকর রয়েছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্মানিত পুলিশ বাহিনীর অবদান এবং শহীদ পুলিশ সদস্যদের স্মৃতি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য অধ্যায়। স্বাধীনতার পর থেকেই পরাজিত অন্ধকারের অশুভ শক্তির চতুর্মুখী চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রে স্বাধীন বাংলাদেশকে বিপন্ন-বিপর্যস্ত করার নানা অপকৌশলকে নস্যাৎ করে দিয়ে দেশ গড়ার কাজে এই বাহিনীর কর্মযজ্ঞ নন্দিত। ৭ জুন ১৯৬৬ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু ‘ম্যাগনাকার্টা’খ্যাত বাঙালীর মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করেছিলেন। তাঁরই নেতৃত্বে দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে ঐতিহাসিক ৭ জুন ১৯৭২ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু আরেক যুগান্তকারী ভাষণ প্রদান করেন।

সে ভাষণে বঙ্গবন্ধু নাতিদীর্ঘ বিশ্লেষণে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা কর্তৃক নির্বাচন বানচালের চেষ্টা, মুক্তি সংগ্রামের সূচনা, দালালদের সমালোচনা, যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি, শিল্প জাতীয়করণ ও শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন, সমাজবিরোধী কার্যকলাপ, জাতির আদর্শ, পাকিস্তানে আটক বাঙালীসহ সমুদয় বিষয়ে জনগণকে সম্যক অবহিত করেন। অভূতপূর্ব এই ভাষণে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ বা মজুদদার, চোরাকারবারি ও চেরাচালানীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘তাদের আমি সোজা কথায় বলে দিচ্ছি, পাঁচ মাস আমি তাদের অনুরোধ করেছি, আবেদন করেছি, বুঝিয়েছি, অনেক করে বলেছি এ কাজ করো না। আমার বিশ্বাস ছিল যে, তারা আমার কথা শুনবে। কিন্তু দেখছি ‘চোরা নাহি শুনে ধর্মের কাহিনী’। তাই তাদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলতে চাই, ‘যারা শহরে সরকারী বাড়ি, গাড়ি দখল করে আছ, যারা অন্যের দোকান বা জমি দখল করে আছ, যারা মজুদ করছো, জিনিসপত্র বিক্রি করছো না, জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছো, তাদের রেহাই নাই... বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান। আর ঘুঘু ধান খাওয়ার চেষ্টা করো না। আমি পেটের মধ্য হতে ধান বের করে ফেলবো।’ ১৯৭৫ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে প্রথম পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘গরিব-দুঃখীর সুখেই স্বাধীনতার সার্থকতা’।

তিনি আরও বলেছেন, ‘জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। এই কথা মনে রাখতে হবে। আমি বা আপনারা সবাই মৃত্যুর পর সামান্য কয়েক গজ কাপড় ছাড়া সঙ্গে আর কিছুই নিয়ে যাব না। ... যারা অন্যায় করবে, আপনারা অবশ্যই তাদের কঠোর হস্তে দমন করবেন। কিন্তু সাবধান, একটা নিরপরাধ লোকের ওপরও যেন অত্যাচার না হয়। তাতে আল্লাহ্র আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠবে। ... আল্লাহ্র নামে প্রতিজ্ঞা করুন, আমরা দুর্নীতির উর্ধে থাকব। প্রতিজ্ঞা করুন ‘আমরা দুর্নীতিবাজদের খতম করব। প্রতিজ্ঞা করুন ‘আমরা দেশকে ভালবাসব, দেশের মানুষকে ভালবাসব, দেশের মাটিকে ভালবাসব।’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘যারা দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, রাতের অন্ধকারে যারা মানুষ হত্যা করে, থানা আক্রমণ করে, অস্ত্র নিয়ে আপনাদের মোকাবেলা করে, বাংলাদেশের মাটি থেকে তাদের উৎখাত করুন।’

করোনাকালের শুরু থেকেই গণমানুষের দুর্বিষহ জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক ও সাবলীল রাখা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকল্পে অতীব জরুরী উপকরণ যেমন মাস্ক, কীট, অক্সিজেন হাইফ্লো অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর নানা সরঞ্জামা আমদানি-ক্রয়-বিক্রয়-সরবরাহের সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের যে দৃশ্যপট জাতি পর্যবেক্ষণ করছে তাতে দুর্বৃত্তরা লজ্জিত না হলেও পুরো জাতিই যারপরনাই এসব উপকরণ ব্যবহারে সন্দেহ সংশয়ে ভুগছে। গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব দুর্বৃত্তের পিছনে সামাজিক, ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনুমেয় যোগসাজশ জাতীয় চরিত্রকে প্রচ- কলুষিত করছে। গরিব-দুঃখী মানুষের অসহায়ত্ব ও করুণ অবস্থাকে অবজ্ঞা করে ত্রাণ বিতরণে জনপ্রতিনিধিদের দুর্বৃত্তপনা জঘন্য অপরাধের দৃষ্টান্ত হয়েছে। চিহ্নিত কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কারণে এই অরাজক দুঃসাহসের পর্যায় অনেকটা স্তিমিত হয়েছে বলে মনে হয়।

করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবা গ্রহণ ও প্রদান, আক্রান্ত-শনাক্তকরণ, হাসপাতালে ভর্তি, সেবা প্রদান না করেও অনৈতিক অর্থ আদায়, বিদ্যুৎ বিলের অসঙ্গতিসহ অনৈতিক সিন্ডিকেটের অসহনীয় পাপাচার অতিশয় উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ঘুরে সামান্য অক্সিজেন বা অক্সিজেনবঞ্চিত ব্যক্তিদের রাস্তা বা গাড়িতে মৃত্যুবরণের যন্ত্রণাদায়ক সংবাদ কোনভাবেই সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না। প্লাজমা সংগ্রহ, করোনামুক্তির ভুয়া রিপোর্ট, আইডি কার্ডসহ নানা অপকৌশলে ঘৃণ্য জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারী বা বেসরকারী সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে দুর্বৃত্তায়নের প্রতিনিয়ত রূপ-রূপান্তর প্রকৃত অর্থে জাতিকে বিভ্রান্ত ও ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলছে। বিশ্বকবি রবিঠাকুরের ‘ত্রাণ’ কবিতার পঙ্ক্তি এক্ষেত্রে সমধিক প্রযোজ্য- ‘এ বৃহৎ লজ্জারাশি চরণ-আঘাতে/ চূর্ণ করি দূর করো। মঙ্গল প্রভাতে/ মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে/ উদার আলোক-মাঝে, উন্মুক্ত বাতাসে ॥’ দেশের সকল দেশপ্রেমিক ও মানবতাবাদী মানুষের হৃদয়ে রবিঠাকুরের এই অমিয় মিনতিরাশি প্রাণশক্তিতে স্পন্দিত। ধর্ম, বর্ণ, দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ এসব দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে সমাজের গতিময়তা ও স্বাভাবিকতা বিপন্ন হবে। আমরা বরাবরই লক্ষ্য করেছি যে, জাতির কোন দুঃসময় বা দুর্যোগে অবাঞ্ছিত, অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত মনোবৃত্তির বহির্প্রকাশ ঘটিয়ে এসব নির্মম কার্যসিদ্ধির মানবরূপী দানবের সংখ্যাও কম নয়।

সমাজকে বিপন্ন করে তুলছে এমন সব অপরাধ ও পাপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হবে পুলিশ বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য। আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং জনগণের দুর্ভোগ-দুর্দশা লাঘবে মানবাধিকার, দেশের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে পুলিশ বাহিনীর অব্যাহত প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে আরও প্রগতি-সৃজনশীল জনবান্ধব প্রক্রিয়ায় গতিশীল ও অত্যুজ্জ্বল হবে- দেশের সাধারণ মানুষের মতো আমিও এই নিবেদনটুকু ব্যক্ত করে নিবন্ধের ইতি টানছি। ‘জনতা-পুলিশ ভাই ভাই, অপরাধ দমনে আপোস নাই’।

লেখক : শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়