লকডাউনেও জীবন সচল তথ্যপ্রযুক্তিতে

ডেস্ক নিউজ

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ১০:৫৯ এএম, ৩০ অক্টোবর ২০২০ শুক্রবার

প্রতিকী ছবি

প্রতিকী ছবি

করোনা মহামারির লকডাউনে জীবনযাত্রাকে সচল রেখেছে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে গত ১১ বছরে বাংলাদেশকে ডিজিটাল অগ্রযাত্রার পথে নিয়ে গেছে। ফলে করোনা মহামারির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব হয়েছে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা।

এ প্রসঙ্গে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের দিকনির্দেশনায় ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তব রূপ পেয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, মহামারির সময়ে অনলাইন নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার কারণে ব্যান্ডউইথের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হলেও ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের কোনো সংকট হয়নি। কারণ, ভবিষ্যৎকে বিবেচনায় নিয়ে ২০১৭ সালেই দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলে সংযুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। সামনে ইন্টারনেটের চাহিদা আরও বাড়বে, এ জন্য বাংলাদেশ তৃতীয় সাবমেরিন কেবলে সংযুক্ত হতে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ফোরজি প্রযুক্তি চালু হয়েছে। এখন ফাইভজির জন্য প্রস্তুতি চলছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে উন্নত বিশ্বের চেয়ে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। এ কারণেই মহামারির এ সময়ে উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও অনলাইনে সভা, সেমিনার, অফিস, স্কুল-কলেজের ক্লাস সবই চলছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তবতা: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বাংলাদেশে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বা রূপান্তরের কথা চিন্তা করা হয়নি। উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করার কোনো পরিকল্পনাও নেওয়া হয়নি। যেমন, ১৯৮৯ সালে বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ নিয়ে ১৯৯২ সাল থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যাওয়া দেশের প্রথম মোবাইল অপারেটর সিটিসেলের সংযোগ ও হ্যান্ডসেটের দাম ছিল আকাশচুম্বী। একেবারে উচ্চবিত্ত ছাড়া আর কারও পক্ষে এ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। ল্যান্ডফোন সুবিধাও সরকারি অফিস এবং শহুরে এলিট শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ বিনামূল্যে সি-মিই-উই-৩ সাবমেরিন কেবলে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ পেলেও তৎকালীন বিএনপি সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে সে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায় এবং বাংলাদেশ উন্নত প্রযুক্তির বিশ্বে প্রবেশের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও পিছিয়ে যায়।

১৯৯৭ সালে গ্রামীণফোন, এরপর একটেল এবং সেবা টেলিকম বাজারে আসার পর ১৯৯৮ সালের মধ্যেই গ্রামে গ্রামে বিস্তৃত হয় মোবাইল নেটওয়ার্ক। একই সঙ্গে সংযোগ মূল্য নেমে আসে পাঁচ হাজার টাকারও নিচে। মূলত এটিই ছিল বড় পরিসরে ডিজিটাল বাংলাদেশের পথচলা। ১৯৯৮ সালে প্রথম জাতীয় টেলিযোগাযোগ নীতিমালা তৈরি হয়, স্বাধীন টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন প্রতিষ্ঠার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয় এবং সি-মিই-উই-৪ সাবমেরিন কেবলে সংযুক্ত হওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়।

কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতায় আসার পর টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত আবারও অবহেলিত হয়ে পড়ে। এ সময় টেলিযোগাযোগ সেবার বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিটিটিবিকে তখনকার একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর কোম্পানির মধ্যস্থতায় একটি বিদেশি কোম্পানির কাছে মোট সম্পদের তিন গুণেরও কম দামে বিক্রির আয়োজন চূড়ান্ত হয়। যদিও সে প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখে। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো সি-মিই-উই-৪ সাবমেরিন কেবলে যুক্ত হলেও এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। ফলে ২০০৯ সাল পর্যন্ত এর মোট সক্ষমতার তিন ভাগের দুই ভাগ ব্যান্ডউইথই পড়ে থাকে ব্যাকহোলে। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম হয় আকাশছোঁয়া। ফলে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কা তখন তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তিতে প্রবেশ করলেও বাংলাদেশ দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি সুবিধার সম্পূর্ণটাও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তৃণমূল পর্যায়ে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বিপুল কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। প্রথমেই ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম প্রায় ১০ গুণ কমানো হয়, সি-মিই-উই-৪ সাবমেরিন কেবলের ব্যাকহোলে পড়ে থাকা ব্যান্ডউইথ সক্ষমতার পুরোটাই কাজে লাগানো শুরু হয় এবং একই সঙ্গে এই সাবমেরিন কেবল থেকে ব্যান্ডইউথ সরবরাহের পরিমাণও বাড়ানো হয়। ২০১২ সালের ১৪ অক্টোবর দেশে তৃতীয় প্রজন্মের টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর ফলে স্মার্টফোন থেকে শুরু করে দেশে নানা ধরনের স্মার্ট প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার বিস্তৃত হতে থাকে। একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দিতে শক্তিশালী অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রতিটি ইউনিয়নে স্থাপিত হয় ইউনিয়ন পরিষদ তথ্যকেন্দ্র, যা পরে ইউনিয়ন ডিজিটাল তথ্য সেন্টারে রূপান্তরিত হয়। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্থাপিত হয় ই-সেবাকেন্দ্র।

 

পাশাপাশি কম্পিউটার ও সকল তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য আমদানিতে শুল্ক্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে প্রযুক্তিপণ্য সাধারণ মানুষের কাছে সুলভ করা হয়। যদিও এ সময় মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানিতে এবং মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবায় উচ্চ হারে ভ্যাট ও কর থাকায় উন্নতমানের স্মার্টফোন ব্যবহার এবং তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তির বিস্তৃতি দুটিই কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। এ অবস্থা দূর হতে খুব বেশি সময়ও লাগেনি। তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তির পর দ্রুততার সঙ্গেই বাংলাদেশ প্রবেশ করে চতুর্থ প্রজন্মের প্রযুক্তিতে। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের ব্যবহার জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। যেখানে ২০১৫ সালেও দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের ব্যবহার ছিল পাঁচশ জিবিপিএসের নিচে, সেখানে ২০১৯ সালের শুরুতেই এর পরিমাণ এক হাজার জিবিপিএস পেরিয়ে যায়।

একইসঙ্গে স্মার্টফোনের বিপুল চাহিদার কারণে দেশে স্মার্টফোন উৎপাদনের জন্য ফেয়ার ইলেকট্রনিক্সের সঙ্গে যৌথভাবে কারখানা স্থাপন করে বিশ্ববিখ্যাত স্যামসাং। এ ছাড়া ট্রানশান বাংলাদেশ (টেকনো), দেশীয় ব্র্যান্ড সিম্ম্ফনি, ওয়ালটনসহ আরও কয়েকটি ব্র্যান্ড দেশেই কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে স্মার্টফোন উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে এই অগ্রযাত্রা আরও দ্রুতগতি পেয়েছে। ইনফো সরকার-৩ প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বিস্তৃত হয়েছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে স্থাপিত হয়েছে হাইটেক পার্ক। দেশের আরও কয়েকটি স্থানেও হাইটেক ও সফটওয়্যার পার্ক স্থাপন করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, নিজস্ব স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ সফলভাবে উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তি সেবাকে আরও প্রসারিত করেছে। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এখন দুর্গম অঞ্চলেও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবাসহ আধুনিক প্রযুক্তির সব সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

মহামারিতেও চালিকাশক্তি তথ্যপ্রযুক্তি :কভিড-১৯ মহামারির কারণে চলতি বছরের পুরোটাই ছিল থমকে থাকা জীবন। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার কারণে উন্নত দেশগুলোর মতোই বাংলাদেশে অনলাইনে কেনাকাটা, অফিস-আদালত পরিচালনা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা সফলভাবে সম্ভব হয়। মহামারির এই সময়ে এক দিনের জন্যও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা ব্যাহত হয়নি। বরং মহামারিকেন্দ্রিক বিভিন্ন তথ্য সমন্বয় ও জরুরি বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটিও সহজে করা গেছে।

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, সীমাবদ্ধতা আছে, সমালোচনাও থাকবে। তারপরও স্বীকার করতেই হবে, গত ১১ বছরে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া সত্যিই বিস্ময়কর এবং গর্বের। দেশ তথ্যপ্রযুক্তিতে এ অবস্থানে না থাকলে এই মহামারির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা বর্তমানে নিঃসন্দেহে আরও অনেক বেশি কঠিন হতো। সূত্র: সমকাল

স/এমএস