স্ত্রীর জন্য রাবির সাবেক ভিসি মিজানউদ্দিনের এতো তথ্য ‘জালিয়াতি’!

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিউজরাজশাহী.কম

প্রকাশিত : ১০:৩৭ এএম, ১ অক্টোবর ২০২০ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ১০:৩৮ এএম, ১ অক্টোবর ২০২০ বৃহস্পতিবার

সাবেক ভিসি মুহাম্মদ মিজানউদ্দিন। ফাইল ফটো

সাবেক ভিসি মুহাম্মদ মিজানউদ্দিন। ফাইল ফটো

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শেখ রাসেল মডেল স্কুলে নিজের স্ত্রীকে ‘সুবিধা’ দিতে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ মিজানউদ্দিনের বিরুদ্ধে তথ্য জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারি অনুমতি ছাড়া বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ ছেলে শেখ রাসেলের নামে স্কুলের নামকরণ, অনুমোদনের আগেই শিক্ষামন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন করানো, ইউজিসির আর্থিক অনুমোদন না থাকার পরও সিন্ডিকেট সভায় স্ত্রীকে সহযোগী অধ্যাপক মর্যাদা দিয়ে ইউজিসিকে না জানিয়ে বেতন-ভাতা দিয়েছেন সাবেক উপাচার্য। এমনই কিছু প্রমাণপত্র এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৬ সালে রাবি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। সেসময় টিনশেড ভবনে (বর্তমান শেখ রাসেল স্কুল ভবন) স্কুলটির কার্যক্রম চলত। ১৯৮৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেটের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ভবন স্থানান্তর করা হলে রাবি মহিলা ক্লাব পুরাতন ভবনটি (টিনশেড ভবন) ব্যবহারের জন্য সেসময়ের উপাচার্যের নিকট আবেদন করেন। একইসঙ্গে এটিকে ‘নার্সারী ও জুনিয়র স্কুল’ হিসেবে চালানোর অনুমতি চাওয়া হয়। মহিলা ক্লাবের সদস্যরা এই স্কুলটির শিক্ষকতা করবেন এবং শিক্ষার্থীদের থেকে সামান্য বেতন নিয়ে নেবেন; যেটি শিক্ষকদের সম্মানী হিসেবে দেওয়া হবে এই ‘শর্তে’ এর কার্যক্রম শুরু হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে আরো জানা যায়, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫০তম সিন্ডিকেট সভায় ‘নার্সারী ও জুনিয়র স্কুল’কে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইউনিটের ডেমোন্ট্রেশন ইউনিট হিসেবে আত্তীকরণ করা হয়। তখন এর নাম দেওয়া হয় ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়’। ২০১৪ সালের ৩১ আগস্টে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫৪তম সিন্ডিকেট সভায় এর নাম পরিবর্তন করে ‘শেখ রাসেল মডেল স্কুল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়’ নামকরণ করা হয়। এর পর ১০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে দিয়ে শেখ রাসেল মডেল স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করানো হয়। অথচ মন্ত্রী যখন উদ্বোধন করেন সেসময় শেখ রাসেলের নামে নামকরণের জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর ও ট্রাস্টের কোনো অনুমতি ছিল না।

এ বিষয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ মিজানউদ্দিন মোবাইলে সমকাল’কে বলেন, ‘কথা উঠেছে আমি সুবিধা দিতে (স্ত্রীকে) সহযোগী অধ্যাপক পদ দিয়েছি। আমি ২০১৭ সালে চলে দায়িত্ব ছেড়েছি; এখনো কিছু শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক মর্যাদার সুবিধা পাচ্ছে। এটা একটা নিয়ম পরিবর্তন। এমন না যে নিজের স্ত্রীকে সুবিধা দিয়ে আইন পরিবর্তন করা হয়েছে। যা কিছু করা হয়েছে সবই স্কুল পরিচালনার জন্য যে অর্ডিন্যান্স আছে সেগুলো মেনেই করা হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে শিক্ষামন্ত্রী ‘শেখ রাসেল মডেল স্কুল’ নামে এর ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। তবে শেখ রাসেল নামকরণের অনুমতি চেয়ে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের সচিবের নিকট ২০১৭ সালের ২ জানুয়ারি তৎকালীন রেজিস্ট্রার ড. মুহাম্মদ এন্তাজুল হক স্বাক্ষরিত চিঠি দেওয়া হয়। আর ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুর কমিশনের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ফেরদৌস জামান স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে রাবি শেখ রাসেল মডেল স্কুলের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে ‘কমিশনের আর্থিক কোনো সংশ্লেষ থাকবে না এই শর্তে’ এর কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেয় ইউজিসি। অপরদিকে একনেক বিদ্যালয়টির প্রশাসনিক অনুমোদন দেয় ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি।

সাবেক উপাচার্য মিজানউদ্দিন বলেন, একনেকে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে রাবির জন্য বাজেট পাস হয়। সেখানে শিক্ষা সচিব উপস্থিত ছিলেন। তিনি এই বিষয়ে (নামকরণের) দেখবেন বলেন, তাই আমরা তার নিকট আবেদন পাঠাই। আসলে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কাছে তো সহজেই সবার পৌঁছানো সম্ভব নয়। সেজন্য আবেদন পৌঁছাতে সরকারি যেসব প্রক্রিয়া আছে সেভাবেই অর্থাৎ শিক্ষা সচিবের মাধ্যরেম অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়।

জানতে চাইলে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান বলেন, ‘একনেক ২০১৭ সালে শেখ রাসেল স্কুল পরিচালনার প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়। সে হিসেবে রাবি শেখ রাসেল স্কুলের বয়স সাড়ে তিন বছর। এর আগে এই নামে যে কার্যক্রম চলেছে সেটি আইনসিদ্ধ নয়। একনেকের অনুমোদনে বর্তমানে স্কুলের নতুন ভবন নির্মাণ কাজ চলছে। নামকরণ অনুমোদনের জন্য সাবেক প্রশাসনের কিছু ত্রুটি ছিল; সেসব ত্রুটি এড়িয়ে সরকারি নিয়মে স্কুল নির্মাণ কাজ চলছে।’

সূত্র: সমকাল, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০।